ঢাকায় কার্যালয় খুলতে জেবিআইসিকে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৮ বার
ঢাকায় কার্যালয় খুলতে জেবিআইসিকে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার এবং দেশে বিদেশি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) একটি কার্যালয় ঢাকায় খোলার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের রাজধানী টোকিওতে জেবিআইসির গভর্নর আমাকাওয়া কাজুহিকোর সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ অনুরোধ জানান। বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে জেবিআইসির সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে তাঁর সরকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, বিধিবিধান সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে।

বৈঠকে ঢাকায় জেবিআইসির কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার কথা জানান সংস্থাটির গভর্নর আমাকাওয়া কাজুহিকো। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা কার্যালয় স্থাপনের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ, সরকারি-বেসরকারি সেবার আধুনিকায়ন এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এসব খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও জেবিআইসি গভর্নরের বৈঠকে আলোচনা হয়।

বাংলাদেশের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রয়োজন। জাপানের মতো প্রযুক্তি ও শিল্পোন্নত দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হলে এসব ক্ষেত্রে নতুন প্রকল্প গ্রহণ, জাপানি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং বাস্তবে বিনিয়োগ চূড়ান্ত হওয়া এক বিষয় নয়। কোনো প্রকল্পে অর্থায়নের আগে এর আর্থিক গ্রহণযোগ্যতা, বাস্তবায়নযোগ্যতা, পরিবেশগত প্রভাব, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নির্ধারণের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হয়। ফলে বৈঠকে আলোচিত সহযোগিতা বাস্তব প্রকল্পে রূপ নিতে হলে পরবর্তী আলোচনা, প্রস্তাব মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় চুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

জেবিআইসির একটি কার্যালয় ঢাকায় স্থাপিত হলে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বিনিয়োগসংক্রান্ত যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে। বর্তমানে কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন, জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় কিংবা দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময় প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে সরাসরি কার্যালয় থাকলে এসব কার্যক্রম পরিচালনায় স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের সুযোগ বাড়তে পারে।

বিশেষ করে জ্বালানি, পরিবহন, শিল্প অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পের মতো বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতি, সরকারি নীতিমালা, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং বেসরকারি খাতের চাহিদা সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় একটি কার্যালয় স্থাপিত হলে জাপানি বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগের একটি স্থায়ী কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে।

তবে সম্ভাব্য এসব সুবিধা নির্ভর করবে কার্যালয়টির দায়িত্ব, জনবল, কার্যপরিধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে সংস্থাটির সম্পৃক্ততার ওপর। শুধু কার্যালয় স্থাপন করলেই বিনিয়োগ বেড়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ, নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত অনুমোদন, স্বচ্ছতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে জাপান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। পরিবহন, বিদ্যুৎ, নগর অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগে দেশটির সহযোগিতা রয়েছে। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী ঘিরে অবকাঠামো উন্নয়নের মতো প্রকল্পে জাপানের সম্পৃক্ততা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে।

জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন একটি নীতিভিত্তিক সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জাপানি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থায়নের মাধ্যমে সংস্থাটি কাজ করে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২৫ সালের মে মাসে জেবিআইসি ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই সমঝোতায় আবাসিক পর্যায়ে প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপনের সম্ভাব্য প্রকল্পের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে ঢাকায় কার্যালয় স্থাপনের অনুরোধকে দুই দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে নতুন কোনো বিনিয়োগ বা প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য বৈঠকসংক্রান্ত ঘোষণায় পাওয়া যায়নি।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে তাঁর সরকার বিভিন্ন বিধিবিধান সংস্কার ও সহজীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের প্রতিশ্রুতির কথাও তিনি তুলে ধরেন।

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে নীতিগত ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার অনুমোদন, জমি ও অবকাঠামোর প্রাপ্যতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, করব্যবস্থার স্বচ্ছতা, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিয়মের মতো বিষয়গুলো বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার করা গেলে জাপানি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব তৈরি হলে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশীয় সরবরাহব্যবস্থার বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে আরও উল্লেখ করেন, জেবিআইসির অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব খাতে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

জেবিআইসির গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. শাকিরুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অর্থনীতি, বিনিয়োগ, আর্থিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিদের উপস্থিতি বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলোর গুরুত্ব নির্দেশ করে।

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ঘিরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। সফরের অংশ হিসেবে জাপানি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

ঢাকায় জেবিআইসির কার্যালয় স্থাপনের অনুরোধ দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। তবে প্রস্তাবটি বাস্তবে কতটা এগোবে, তা নির্ভর করবে জাপানি কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন, দুই পক্ষের পরবর্তী আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর। এখন পর্যন্ত গভর্নর প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা জানিয়েছেন; কার্যালয় স্থাপনের চূড়ান্ত অনুমোদন বা উদ্বোধনের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।

বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে সম্ভাব্য সহযোগিতাকে বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপ দেওয়া। জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, আইসিটি খাতে সহযোগিতা বাড়লে ডিজিটাল সেবা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।

এসব সুবিধা অর্জনের জন্য প্রকল্প নির্বাচন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিদেশি অর্থায়নের শর্ত, ঋণ পরিশোধের দায় এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফলও সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।

সব মিলিয়ে, টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জেবিআইসি গভর্নর আমাকাওয়া কাজুহিকোর বৈঠকে ঢাকায় কার্যালয় স্থাপনের অনুরোধ এবং জ্বালানি, আইসিটি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আলোচনা বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা সামনে এনেছে। এখন প্রস্তাবটির পরবর্তী অগ্রগতি এবং আলোচনার ভিত্তিতে বাস্তব প্রকল্প গ্রহণের দিকে নজর থাকবে। দুই দেশের সহযোগিতা কার্যকর বিনিয়োগ ও সাধারণ মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারলে এ উদ্যোগের সুফল দেশের অর্থনীতিতে আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com