চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলে জোর রাষ্ট্রপতির

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৯ বার
চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলে জোর রাষ্ট্রপতির

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, চিকিৎসা কেবল একটি পেশা নয়; এটি মানুষের জীবন, মর্যাদা ও আশার সঙ্গে সম্পর্কিত এক মহান দায়িত্ব। তাই চিকিৎসাসেবার প্রতিটি পর্যায়ে পেশাগত দক্ষতা, মানবিকতা, জবাবদিহি এবং রোগীর প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আধুনিক ও জনবান্ধব করতে হলে শুধু হাসপাতাল বা যন্ত্রপাতি বাড়ালেই হবে না; সেবার মান উন্নয়ন এবং চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগীর আস্থাও অর্জন করতে হবে।

বাংলাদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। জটিল রোগের চিকিৎসা, বিশেষায়িত অস্ত্রোপচার, উন্নত পরীক্ষার সুযোগ কিংবা চিকিৎসার ফলাফল নিয়ে আস্থার সংকট—বিভিন্ন কারণে রোগী ও তাঁদের পরিবার বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এতে চিকিৎসাব্যয়ের পাশাপাশি যাতায়াত, আবাসন এবং পরিবারের সদস্যদের থাকা-খাওয়ার খরচও যুক্ত হয়। অনেক পরিবারের জন্য এই ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সবার পক্ষে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ সমান থাকে না।

দেশের ভেতরে উন্নত চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা গেলে রোগীদের বিদেশমুখী হওয়ার চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ জন্য হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স, আধুনিক পরীক্ষাগার, উন্নত অস্ত্রোপচারব্যবস্থা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পরিচর্যার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রোগ নির্ণয় থেকে চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় মান নিশ্চিত করাও জরুরি।

রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে বিগত ১৭ বছরে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এসব কারণে স্বাস্থ্যখাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে সময়মতো চিকিৎসা, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামো ও জনবল পরিকল্পনার বিষয়টিও উঠে আসে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত না করে ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার সমালোচনা করে তিনি স্বাস্থ্য খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর বিনিয়োগের জন্য শুধু যন্ত্রপাতি কেনা যথেষ্ট নয়। সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থা থাকা দরকার। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের উপস্থিতি, রোগী ব্যবস্থাপনা, ওষুধ সরবরাহ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতাল অনেক সময় চিকিৎসার প্রধান ভরসা। সেখানে সেবা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে অতিরিক্ত ব্যয় কিংবা ওষুধের সংকট দেখা দিলে তাঁদের আর্থিক ও শারীরিক দুর্ভোগ বাড়ে। তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন মূল্যায়নে নতুন ভবন বা যন্ত্রপাতির সংখ্যার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ কতটা সহজে, সময়মতো ও সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সম্মেলনের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোলন ও রেক্টাল বা বৃহদান্ত্র ও মলাশয়সংক্রান্ত রোগের চিকিৎসা এবং জনসচেতনতার গুরুত্বও আলোচনায় আসে। এ ধরনের রোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় লজ্জা, সংকোচ কিংবা সচেতনতার অভাবে রোগীরা চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। ফলে কিছু রোগ জটিল পর্যায়ে পৌঁছানোর পর চিকিৎসা শুরু করতে হয়।

পেটের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, মলত্যাগের অভ্যাসে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া কিংবা অকারণ ওজন কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এসব উপসর্গের একাধিক কারণ থাকতে পারে; তাই এগুলো দেখা দিলেই কোনো নির্দিষ্ট রোগ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করার সুযোগ বাড়ানো গেলে অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা সম্ভব। তবে কোন বয়সে বা কার জন্য কী ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন, তা ব্যক্তির উপসর্গ, পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।

এ কারণে দেশের হাসপাতালগুলোতে কোলোরেক্টাল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, রোগীর কাউন্সেলিং এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পরিচর্যার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। চিকিৎসা সম্পর্কে অজ্ঞতা ও সামাজিক সংকোচ দূর করতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্মেলনে একটি জাতীয় কোলোরেক্টাল সার্জারি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করা হয়। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি যথাযথ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বলে সম্মেলন-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

বিশেষায়িত একটি জাতীয় ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হলে কোলন ও রেক্টাল রোগের উন্নত চিকিৎসা, জটিল অস্ত্রোপচার, গবেষণা এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চিকিৎসকদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এমন প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজধানীকেন্দ্রিক সেবা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সঙ্গে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরাও প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ পান।

দুই দিনব্যাপী কোলোরেক্টাল সার্জারি সম্মেলনে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতি সম্মেলনের সফলতা কামনা করে চিকিৎসকদের অর্জিত জ্ঞান সাধারণ মানুষের সেবায় কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন প্রযুক্তি, অস্ত্রোপচারের আধুনিক পদ্ধতি এবং রোগী ব্যবস্থাপনার উন্নত কৌশল দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ কারণে চিকিৎসকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণায় অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এসব জ্ঞান দেশের বাস্তবতা, রোগীদের আর্থিক সক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করতে হবে।

সম্মেলনে উপস্থিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধিদের জন্য এ ধরনের আয়োজন অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের একটি ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে সম্মেলনের অর্জন দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করতে হলে প্রশিক্ষণ, গবেষণা, হাসপাতালভিত্তিক উন্নয়ন এবং রোগীদের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, কোলোরেক্টাল সার্জারি সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, সাশ্রয়ী, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক করার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পেয়েছে। দেশের ভেতরেই বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের চাপ কমানোর পাশাপাশি মানুষের অর্থ সাশ্রয়, চিকিৎসায় সমান সুযোগ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আস্থা বৃদ্ধির পথ তৈরি হতে পারে।

তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল, মানসম্মত চিকিৎসা, কার্যকর তদারকি এবং রোগীর মর্যাদা ও অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া। শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য নির্ধারিত হবে সাধারণ মানুষ কতটা সহজে, নিরাপদে ও সাশ্রয়ী মূল্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন, তার ভিত্তিতেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com