প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঢাকা: বাংলাদেশে স্থানীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে ভোটারদের সন্তুষ্টির মাত্রা নির্ণয় করতে করা একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দলগুলোর জনপ্রিয়তা ও কার্যক্রমে সন্তুষ্টি সর্বদা সমান নয়। বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনোভেশন কনসাল্টিং তাদের ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে রাউন্ড টু’-এর দ্বিতীয় অংশের ফলাফল প্রকাশ করেছে।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁও আর্কাইভ ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াত সরওয়ার জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, স্থানীয় রাজনীতির বিভিন্ন দল এবং তাদের কার্যক্রম নিয়ে ভোটারদের ধারণা এবং সন্তুষ্টির হার সমীক্ষার মূল বিষয় ছিল।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, সাধারণভাবে অন্যান্য দলের তুলনায় ভোটাররা জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে বেশি সন্তুষ্ট। বিশেষভাবে, তরুণ প্রজন্ম এবং নারীরা জামায়াতের কার্যক্রমে তুলনামূলকভাবে বেশি সন্তুষ্ট। এই জরিপে বিএনপির কার্যক্রমে সন্তুষ্ট ভোটারের হার ৮.২ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামীতে ১৩.৭ শতাংশ, এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তে ৯.১ শতাংশ।
ফলে দেখা যাচ্ছে যে, কার্যক্রমের গুণগত মান এবং ভোটার সন্তুষ্টি সবসময় জনপ্রিয়তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। যদিও বিএনপি জনপ্রিয়তার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে, তবুও স্থানীয় কার্যক্রমে ভোটারদের সন্তুষ্টির হার তুলনামূলকভাবে কম। জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যাদের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ৪১.৩০ শতাংশ। এরপর অবস্থান করছে জামায়াতে ইসলামী, যাদের প্রতি ৩০.৩০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে। গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ তৃতীয় স্থানে রয়েছে, তাদের ভোটের হার ১৮.৮০ শতাংশ, এবং নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৪.১০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন নিয়ে তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এমন ধারা লক্ষ্য করা গেছে যে, ভোটাররা স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রমের ফলাফল এবং দলের সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে, যুব সমাজ এবং নারীরা তাদের এলাকায় সামাজিক কর্মকাণ্ড, স্বচ্ছতা এবং সেবামূলক কার্যক্রমের ভিত্তিতে দলগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন করছেন। এই দিক থেকে জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে বেশি সন্তুষ্টি অর্জন করেছে।
মো. রুবাইয়াত সরওয়ার বলেন, “আমাদের জরিপ থেকে এটা স্পষ্ট যে, ভোটারদের সন্তুষ্টি এবং দলের জনপ্রিয়তা সবসময় একই অনুপাত অনুসরণ করে না। বিএনপি জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তা বজায় রেখেছে, তবে স্থানীয় পর্যায়ের কার্যক্রমে তাদের সন্তুষ্টি হার তুলনামূলকভাবে কম। জামায়াতে ইসলামী তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।”
জরিপে দেখা গেছে যে, স্থানীয় কার্যক্রমের প্রতি সন্তুষ্টি নির্ণয়ে শিক্ষার স্তর, বয়স, লিঙ্গ এবং সমাজিক পটভূমি বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষভাবে তরুণ ভোটাররা কার্যক্রমের বাস্তব প্রভাব এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য দলের ভূমিকা মূল্যায়ন করছেন। নারীরা স্থানীয় পরিষেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে দলের কার্যক্রমকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিচ্ছেন।
এছাড়াও, জরিপে অংশগ্রহণকারীরা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দলগুলোর অন্তর্দলীয় সংহতি, এবং স্থানীয় স্তরে মানুষের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেছেন। স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রমের সন্তুষ্টি ভোটারদের মধ্যে দলের প্রতি আস্থা এবং ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপি বর্তমানে শীর্ষে থাকলেও স্থানীয় কার্যক্রমে তাদের কম সন্তুষ্টি ভোটারদের নজরে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি প্রমাণ করে যে স্থানীয় স্তরে কার্যকরী প্রকল্প ও সরাসরি জনগণের সাথে সংযোগ রাখা দলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে সহায়ক।
জরিপের তথ্য অনুসারে, ভোটাররা স্থানীয় পরিষেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রভৃতির ক্ষেত্রে দলগুলোর কার্যক্রমের ওপর গভীর মনোযোগ দিচ্ছেন। এই কারণে জামায়াতের স্থানীয় কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে বেশি সন্তুষ্টি অর্জন করেছে।
এনসিপি এবং আওয়ামী লীগকে ভোটাররা স্থানীয় কার্যক্রমে বেশ কম সন্তুষ্টি দেখিয়েছেন। বিশেষ করে নতুন দল হিসাবে এনসিপির কার্যক্রমে ভোটারদের সন্তুষ্টি ৪.১০ শতাংশ, যা নির্দেশ করছে যে দলটির স্থানীয় কার্যক্রম এখনও পর্যাপ্তভাবে জনগণের কাছে পৌঁছায়নি। এছাড়া, আওয়ামী লীগের স্থানীয় কার্যক্রমে ১৮.৮০ শতাংশ সন্তুষ্টি দেখা গেছে।
ভোটারদের মতামত থেকে পরিষ্কার হচ্ছে যে, স্থানীয় রাজনৈতিক কার্যক্রমের মান ও প্রভাব ভোটারের আস্থা ও সমর্থনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। যেখানে কার্যক্রম ফলপ্রসূ এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রাখে, সেখানে ভোটার সন্তুষ্টি তুলনামূলকভাবে বেশি।
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে যে, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য শুধুমাত্র জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রমের মান ও কার্যকারিতা ভোটারের প্রতিক্রিয়া এবং ভোটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এই দিক থেকে জামায়াতে ইসলামী ভোটারদের মধ্যে তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে আস্থা ও সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
জরিপটি স্থানীয় রাজনীতিতে দলের কার্যক্রম এবং ভোটার সন্তুষ্টির মধ্যকার সম্পর্ককে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের জরিপ রাজনৈতিক দলগুলোকে স্থানীয় কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেবে।