এস আলম ও তিন ভাইকে ইন্টারপোলের রেড নোটিশে আনার নির্দেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪৫ বার
এস আলম ও তিন ভাইকে ইন্টারপোলের রেড নোটিশে আনার নির্দেশ

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী ও এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম ও তার তিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার সকালে দুদকের (দুর্নীতি দমন কমিশন) আবেদনের ভিত্তিতে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক সাব্বির ফয়েজ এ নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা আর্থিক কেলেঙ্কারি, অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নতুন করে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এস আলম গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। গ্রুপটির চেয়ারম্যান সাইফুল আলম ছাড়াও তার ভাই রাশেদুল আলম, মারুফ আলম এবং মাজেদুল আলমকে এ মামলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা বিভিন্ন সময়ে বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন এবং সেসব অর্থ দিয়ে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। দুদক এ ব্যাপারে আদালতের কাছে রেড নোটিশ জারির আবেদন করলে বিচারক তা মঞ্জুর করেন। ফলে এখন আন্তর্জাতিকভাবে তাদের গ্রেপ্তার ও দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে গত ২৩ জুলাই এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেডের বিরুদ্ধে ১৩ হাজার ৩১৭ কোটি টাকার ঋণ খেলাপির মামলায় আদালত প্রতিষ্ঠানটির সম্পত্তি ও শেয়ার হস্তান্তর বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। সুপার এডিবল অয়েল মূলত এস আলম গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান, যা অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি করে তা পরিশোধন ও বাজারজাত করত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি ইসলামী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে নেওয়া ঋণের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়।

দুদকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে এস আলম সুপার এডিবল অয়েল নিয়মিতভাবে ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করত। প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের পাওনা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৩০ হাজার ৮১৩ টাকা। এর বিপরীতে জামানত হিসেবে জমা রাখা হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ৭২৬ শতক জমি, কিছু কারখানা ও যন্ত্রপাতি, যার মোট মূল্য সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা। এই অঙ্ক পাওনা টাকার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য, যা ব্যাংকের জন্য মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এস আলম গ্রুপ নিয়ে সমালোচনা নতুন কিছু নয়। এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করেছে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে। কিন্তু সেই ঋণের বেশিরভাগই উদ্দেশ্য অনুযায়ী ব্যবহার না করে অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে শুধু ব্যাংক খাত নয়, দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ ধরনের ঋণ জটিলতা গোটা ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিষয়টি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, এস আলম গ্রুপের মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। দুদকের অভিযোগে বলা হয়, সাইফুল আলম ও তার ভাইরা অর্থ পাচারের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে সম্পদ গড়ে তুলেছেন। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে কেবল দেশীয় আইনই নয়, আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধ দমন ব্যবস্থার আওতাতেও তাদের জবাবদিহি করতে হবে।

অন্যদিকে, এস আলম গ্রুপের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করা হচ্ছে যে, তারা কোনো ধরনের অর্থ পাচার বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িত নন। ঋণখেলাপি মামলার বিষয়ে তাদের বক্তব্য, বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দামের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি, ডলারের সংকট ও আমদানি ব্যয়ের অতিরিক্ত চাপের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এই যুক্তি আদালত ও তদন্ত সংস্থার কাছে তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এস আলম গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠী যখন ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে এবং তার সঙ্গে অর্থ পাচারের মতো অভিযোগ যুক্ত হয়, তখন তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্যও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোকে প্রায়ই ঋণখেলাপি মামলার দায় এড়াতে দেখা যায়। কিন্তু এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হলে তা একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে, যা ভবিষ্যতে অন্য প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে আইনের আওতায় আনতে সহায়তা করতে পারে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কার্যকর হলে তাদের গ্রেপ্তার ও দেশে ফেরানো কতটা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের আদালতের অনুরোধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করতে পারে। এর ফলে সেই ব্যক্তিরা বিশ্বের যেকোনো দেশে ধরা পড়লে তাদেরকে অনুরোধকারী দেশের কাছে হস্তান্তর করা যায়। তবে এটি অনেকাংশেই নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আইনি চুক্তি ও সহযোগিতার ওপর।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আর্থিক কেলেঙ্কারি, ব্যাংক ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের দাবি, যেই হোক না কেন, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। আদালতের এই নির্দেশকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তবে দেশের আর্থিক খাতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এস আলম ও তার তিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দেশের বিচারব্যবস্থা ও আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ। এটি প্রমাণ করে, প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতাশালী কোনো ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তবে এই প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ এর ওপর নির্ভর করছে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ভাগ্য নয়, বরং গোটা ব্যাংকিং খাত এবং দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার ভবিষ্যত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত