প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সুপ্রিম কোর্টে অনুষ্ঠিত এক আলোচনাসভায় পক্ষে–বিপক্ষে তর্কের মধ্য দিয়েই দাবি করেন যে, যদি দেশে জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের পদ্ধতি হিসেবে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ব্যবহৃত হয়, তবে তা দলীয় স্বৈরতন্ত্র এবং সামগ্রিকভাবে দেশের স্থায়ী অস্থিতিশীলতার জন্ম দেবে। তিনি বলেন, “কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে সেটা সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে” এবং সংবিধানের ধারার আলোকে সরাসরি ভোটের উপর জোর দেন। পিআর প্রণয়ন বা প্রয়োগের ইস্যুকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক মঞ্চ ও গণমাধ্যমে যে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এই মন্তব্য নতুন ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা যোগ করেছে।
সালাহউদ্দিনের বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘস্থায়ী দুইটি আশঙ্কা: প্রথমত, পিআর পদ্ধতির প্রয়োগ যদি কোন একক প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে অনায়াসে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয় বা একটি একপক্ষীয় শাসনব্যবস্থা জাঁকিয়ে দেয় তাহলে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়বে; দ্বিতীয়ত, পিআরয়ের উদ্দেশ্য হিসাবে যে বেশি আসন পাওয়ার লক্ষ্যকে কিছু রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তিনি বলেন, পিআর চাওয়ার একটি উদ্দেশ্য হলো বেশি সিট পাওয়া, আরেকটি হচ্ছে দেশে অনৈক্য ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে মেজরিটি পার্টি ক্ষমতায় না আসতে পারে। সালাহউদ্দিনের চোখে পিআর নীতি সংসদীয় গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এমন একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
বক্তব্যে তিনি জরিপের ফলাফলসমূহকেও দুর্বল ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, “জরিপে দেখা গেছে ৫৬ শতাংশ মানুষ পিআর কী বুঝে না। কিন্তু তারা (জামায়াত) বলছে ৭০ শতাংশ মানুষ পিআর চায়। এগুলো বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাবে না।” এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, দরকার আছে ব্যাপক সচেতনতা, জনশিক্ষা ও গণতান্ত্রিক আলোচনার — নইলে পদ্ধতিগত পরিবর্তনকে জনমতের উপর ভিত্তি করে সুষ্ঠুভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হবে না বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সালাহউদ্দিন সংবিধানের প্রতি জোর দিয়ে বলেন, সংবিধানেই প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের কথা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যায়িত রয়েছে এবং যদি কোন বড় ধরনের নির্বাচনগত পরিবর্তন আনা হয়, সেক্ষেত্রে সেটি সংবিধানগত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মেনে করা উচিত। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংবিধানগত সীমারেখা বাইরেই কোনো রকম রাজনৈতিক রদবদল বা নির্বাচনপদ্ধতিতে হঠাৎ করে পরিবর্তন করলে তা ক্ষেত্রে সম্ভাব্য আইনগত জটিলতা ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, পিআর বনাম সরাসরি ভোট বিষয়ক বিতর্কটি কেবল নির্বাচনগত প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা বিতরণ, লিপিবদ্ধ প্রতিনিধিত্ব এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। পিআরের সমর্থকরা আর্জি করেন যে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র দলগুলোকে সুবিচারমূলক সাংবিধানিক কণ্ঠ দেয় এবং বহুদলীয়তাকে দৃঢ় করে। পক্ষান্তরে বিরোধীরা যুক্তি দেন যে, অযথা জটিল অনুপাতিকতা বড় বড় দলগুলোর মধ্যে বিভাজন ও অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে এবং ক্ষমতার একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছকে রূপ নিতে পারে। সালাহউদ্দিনের বক্তব্যে এই লোকজাগরণটির প্রতিফলন দেখা যায়—তাঁর মতে পিআর যদি অপব্যবহৃত হয়, তা দেশকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ফেলবে।
রাজনীতিকদের মধ্যে এই বিতর্কের তীব্রতা বাড়ার পেছনে সামাজিক গণমাধ্যম ও জনমত জরিপগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সালাহউদ্দিন উল্লেখ করেন যে, অনেকে জনমত হিসাবে জরিপ ফল ব্যবহার করে দ্রুতকেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সহায়ক তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করছে, অথচ জরিপের পদ্ধতি, নমুনা আকার ও মানুষের পক্ষে পিআর সম্পর্কিত ধারণার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত আলোচনা হচ্ছে না। তিনি দাবি করেন যে, যথাযথ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও ব্যাপক জন-আলাপ ছাড়া এমন পরিবর্তন দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
অন্য দিকে পিআর পদ্ধতির প্রস্তাবকরা বলছেন, বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় সংখ্যালঘু ও নির্দিষ্ট অংশের কণ্ঠকেই পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়া হয় না। তারা আর্জি করেন যে পিআর ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বের মান বৃদ্ধি পাবে এবং নীতি নির্ধারণে আরও সমতুল্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। এই পক্ষপাতীরাও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে সরাসরি ভোট পদ্ধতিতে একচেটিয়া শক্তি জন্ম নিতে পারে, যা গণতান্ত্রিক নীতির বিরোধী। তাই তাদের দাবি, পিআর বিষয়ে সূচিত বিতর্কে সমগ্র রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজকে যুক্ত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া চালানো উচিত।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, পিআর-সংক্রান্ত বিতর্ক দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। সালাহউদ্দিনের সতর্ক বার্তা রঙিন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সামাজিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাঁর বক্তব্য—যদি পদ্ধতিগত বদল জাতীয় সংবিধান ও গণতান্ত্রিক নীতির সীমা অতিক্রম করে, তবে তা অনিবার্যভাবে রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিরতার রূপ নেবে—এই আশঙ্কা রাজনৈতিক আলোচনায় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে এই ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় বা বিরোধিতার রূপরেখা ও ভবিষ্যৎ কৌশল কিভাবে গড়ে উঠবে, তা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের নির্বাচনী ভবিষ্যৎ এবং সংবিধানগত রক্ষার দিক নির্দেশ করবে। সালাহউদ্দিনের আহ্বান যে, সংবিধান ও জনগণের প্রশিক্ষিত সচেতনতা ছাড়া কোনো বড় ধরনের নির্বাচনগত পরিবর্তন আনা উচিত নয়—এই আহ্বান আগের যে কোনো সময়ের চাইতে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বর্তমান রাজনীতিতে প্রতিধ্বনি করছে। আগামী সময়ে এই বিতর্ক রাজনীতিক কর্মসূচি, অন্যতম রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল এবং সর্বোপরি জনগণের অংশগ্রহণমূলক আলোচনার মাধ্যমে কিভাবে মীমাংসা পাবে, সেটাই নির্ধারণ করবে দেশটির গতি।