প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও মূল প্রশ্ন হচ্ছে সুশাসন নিশ্চিত করা। কারও মতে নির্বাচন দ্রুত হওয়া উচিত, আবার কেউ কেউ বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার আরও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকুক। এ প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, “মানুষ নানা কথা বলে। কেউ বলে পাঁচ বছর থাকুন, ১০ বছর থাকুন, ৫০ বছর থাকুন। আবার কেউ প্রশ্ন করে, নির্বাচনেরই বা দরকার কী? কার দরকার নির্বাচন?”
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগদানের ফাঁকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার টকশো ‘হেড টু হেড’-এ ব্রিটিশ-আমেরিকান সাংবাদিক মেহেদি হাসানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস এই বক্তব্য দেন। সোমবার রাতে জেটিও (Justice, Equality, Truth Organization) এ সাক্ষাৎকারের একটি অংশ প্রচার করে।
প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে থাকা ড. ইউনূসকে প্রশ্ন করা হয়—বাংলাদেশে কেন নির্বাচন বিলম্বিত হচ্ছে, যেখানে নেপালের অন্তর্বর্তী সরকার ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল? এর জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে পরিস্থিতি আলাদা। সংস্কার ছাড়া কেবল নির্বাচন আয়োজন করলে পুরনো সমস্যাই ফিরে আসবে। তার ভাষায়, “আমাদের সামনে তিনটি কাজ—সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন। যদি শুধু নির্বাচন করি, তবে আগের মতোই হবে। আইন, নিয়ম, পদ্ধতি একই থাকলে আবার সেই শাসন ফিরে আসবে। আমরা চাই না ফ্যাসিবাদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠুক।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ছাত্রদের নেতৃত্বে যে গণআন্দোলন থেকে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার অন্যতম দাবি ছিল কাঠামোগত সংস্কার। সেই দাবির বাস্তবায়ন নিশ্চিত না করে নির্বাচন হলে আন্দোলনের উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না। তাই নির্বাচনকে সামনে এনে জনগণকে আবারও পুরনো সংকটে ফেলার কোনো ইচ্ছে সরকারের নেই।
মেহেদি হাসান প্রশ্ন করেন, “যারা বলছেন আপনি আরও পাঁচ-দশ বছর থাকুন, তারা তো গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। কিন্তু যারা গণতন্ত্রে আস্থা রাখেন, তারা প্রশ্ন তুলছেন কেন এত দেরি হচ্ছে?” জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এসব মন্তব্য কেবল গণতন্ত্র নয়, বরং সুশাসনের চাহিদা থেকে এসেছে। তার মতে, মানুষ চায় দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্থিতিশীল রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা। এজন্যই অনেকে নির্বাচনের আগে সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে নির্বাচন করার পরিকল্পনা ছিল, তবে রমজান মাস সামনে থাকায় সময়সূচি কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নানা বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকারকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া জরুরি।
সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও কথা বলেন ড. ইউনূস। তিনি উল্লেখ করেন, এই সংকট কেবল মানবিকই নয়, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গেও তাকে প্রশ্ন করা হয়। এ বিষয়ে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট দল নয়, বরং যেকোনো ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ও দমনমূলক রাজনীতির শেকড় উপড়ে ফেলা তাদের দায়িত্ব।
সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ড. ইউনূস আবারও স্পষ্ট করেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য দ্রুত নির্বাচন নয়, বরং টেকসই পরিবর্তন আনা। তিনি বলেন, “আমরা যদি শুধু নির্বাচনে যাই, তবে পুরনো ক্ষমতাধারী কাঠামো আবার ফিরে আসবে। আমরা চাই নতুন কাঠামো, যেখানে দুর্নীতি, স্বৈরশাসন ও অগণতান্ত্রিক প্রথার কোনো স্থান থাকবে না।”
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ড. ইউনূসের এই বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও ভবিষ্যতের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া জনগণের অধিকার খর্ব করা হতে পারে। আবার অন্যদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের জন্য এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে।
বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা থাকলেও এই সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা আবারও পরিষ্কার করে দিলেন যে অন্তর্বর্তী সরকার তার নির্ধারিত এজেন্ডা সম্পন্ন না করে কেবল নির্বাচন আয়োজন করবে না। তার মতে, গণতন্ত্রকে টেকসই করার জন্য এখন সংস্কারই সবচেয়ে বড় কাজ।