প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের মতো সাক্ষ্য প্রদান শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলের মাধ্যমে এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
এই মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করছেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। সঙ্গে আছেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ান ও অন্যান্য প্রসিকিউটররা। মামলার প্রক্রিয়া অনুযায়ী, প্রত্যেক দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি অভিযোগের সার্বিক প্রমাণ এবং ঘটনার ধারা সম্পর্কে আদালতকে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর জোহা সাক্ষ্য দেওয়ার সময় উল্লেখ করেছেন, জুলাই আন্দোলন দমন করতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফোনে হাজারো নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন। এই নির্দেশনার মাধ্যমে আন্দোলন দমন ও বিক্ষোভে জড়িত ব্যক্তিদের উপর প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের প্রমাণ খুঁজে পাওয়া গেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর জোহা আরও জানিয়েছেন, ওই কলরেকর্ডসমূহ মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। এনটিএমসির সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন এবং সাবেক এক পরিকল্পনা মন্ত্রীর কল রেকর্ডও মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রমাণ অনুসারে, এটি একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ ছিল, যা মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডকে লুকানোর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্যগ্রহণের পাশাপাশি, আজ ট্রাইব্যুনাল-২ তেও রংপুরের বেরোবির শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মামলায় ৯ম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে আদালত পুরো ঘটনার ক্রম ও দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকার ওপর বিস্তারিতভাবে নজর রাখছে।
সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালীন সময়ে প্রসিকিউটররা বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা সক্রিয়ভাবে বিক্ষোভ দমন ও আন্দোলনকারীদের উপর কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে জড়িত ছিলেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে আদালত প্রমাণ সংগ্রহ করছে এবং ভবিষ্যতে দণ্ডের সিদ্ধান্তের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনামূলক কলগুলো কার্যকরভাবে আন্দোলন দমন এবং গণঅভ্যুত্থানের চিহ্নিত নেতাদের ওপর প্রভাব বিস্তারে ব্যবহৃত হয়েছে। আদালতে প্রদত্ত প্রমাণ অনুযায়ী, এই নির্দেশনার মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রয়োজনে সরাসরি নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল।
আদালত সূত্র জানায়, এই মামলার মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের দিকগুলো ব্যাপকভাবে যাচাই করা হচ্ছে। আদালত প্রত্যেক প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে।
ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত প্রসিকিউটররা জানান, এই মামলায় মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ঘটনার সত্যতা উদঘাটন এবং যারা মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তদন্ত কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত সেই সব দিক পর্যালোচনা করছে।
সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালীন, আদালতের প্যানেল মামলার প্রত্যেক সাক্ষীকে গুণগতভাবে যাচাই করছে। এ প্রক্রিয়া সুনিশ্চিত করছে যে, তথ্য ও প্রমাণ যথাযথভাবে আদালতে উপস্থাপিত হচ্ছে এবং মামলা যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে, মামলার তৃতীয় দিনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রসিকিউটররা জানান, আগামী দিনে আরও বিস্তারিত সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। প্রত্যেক সাক্ষী তাদের দায়িত্বশীলভাবে তথ্য প্রদান করছে, যা মামলার পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই মামলার মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন ও সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কিত তথ্য আদালতে উপস্থাপিত হচ্ছে। এর ফলে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে শক্তিশালী প্রমাণ তৈরি হচ্ছে।
সাক্ষ্যগ্রহণের প্রক্রিয়া বিচারিক প্যানেলের তত্ত্বাবধানে সুষ্ঠুভাবে চলছে। প্রত্যেকদিন সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এই মামলায় প্রধান অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য আদালতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেশের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
সমাপ্ত সাক্ষ্যগ্রহণ ও প্রমাণ যাচাইয়ের পর ট্রাইব্যুনাল আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করবে। মামলার প্রক্রিয়া দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি নজরকাড়া বিষয়।
সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে স্পষ্ট হচ্ছে যে, জুলাই আন্দোলনের সময় প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কিভাবে আন্দোলন দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আদালতের এই প্রক্রিয়া দেশের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
এভাবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহের অধ্যায় হিসেবে রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হবে।