প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মঙ্গলবার ঘোষণা করেছে একটি ব্যাপক নতুন কর্মসূচি, যার লক্ষ্য পাঁচ দফা গণদাবি বাস্তবায়নের পক্ষে সারাদেশে জনমত গড়ে তোলা। সংগঠনের শীর্ষনেতা—আমির মাওলানা মামুনুল হক ও মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ এক যৌথ বিবৃতিতে এই কর্মসূচির বিবরণ জানান। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সরকারের প্রতি স্পষ্ট বার্তা পাঠাবে যে জনগণের ন্যায্য দাবি অব্যাহত উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার পথে তারা যাবে।
খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে পরিমিত ভঙ্গিতে দেওয়া বিবৃতিতে সংগঠনটির প্রধান দুই নেতা বিষয়টির ন্যায়সংগত কারণ তুলে ধরেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই পাঁচ দফা হলো: জুলাই সনদ অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা, জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষে প্রস্তাবিত পিআর পদ্ধতি কার্যকর করা, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, আগামী নির্বাচনে প্রকৃত লেভেল ফিল্ড নিশ্চিত করা এবং জুলাই গণহত্যার বিচারের নমুনা দৃশ্যমান করা। উল্লেখ্য, এগুলো খেলাফত মজলিসের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে এবং তারা এবার সেগুলোকে বাস্তবায়নের বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংগঠনটি বলেছে, দেশের রাজনীতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা ভয়াবহ এবং জাতির অধিকাংশ মানুষের ন্যায্য দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে। বিবৃতিতে যুক্ত করা হয়েছে, সরকারের কিছু নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক প্রভাবশালীদের প্ররোচনায় জাতীয় স্বার্থ অবমূল্যায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং এতে দেশের স্বতন্ত্র পরিচয় ও সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খেলাফত মজলিস দাবি করেন, ডিসেম্বরের আন্দোলন ও জুলাইয়ের গণআন্দোলন যে চাহিদা তৈরি করেছিল, সেগুলোই এখন জাতীয় ভূমিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।
বিবৃতিতে কর্মসূচির সময়সূচি ও পদ্ধতিও সংক্ষেপে জানানো হয়েছে। তারা প্রথম ধাপে পহেলা অক্টোবর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে ব্যাপক গণসংযোগ কর্মসূচি চালাবেন। এই সময় তারা জেলা ও থানা পর্যায়ে সনদের আইনি ভিত্তি এবং পাঁচ দফা দাবির পক্ষে মতবিনিময় সভা, গোলটেবিল বৈঠক এবং সেমিনার আয়োজন করবেন। দ্বিতীয় গণঅংশে তারা ১০ অক্টোবর রাজধানী ঢাকায় একটি বড় গণমিছিল করার পরিকল্পনা নিয়েছে, যেখানে দল-মত ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও জনমানুষের অংশগ্রহণ আকাঙ্ক্ষিত হবে। তৃতীয়ত, ১২ অক্টোবর সারাদেশে জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি পেশ করার মাধ্যমে তারা সরকারকে বিরতিহীনভাবে জনগণের দাবি পৌঁছে দেবেন। খেলাফত মজলিসের নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, সরকার যদি জনগণের ন্যায্য দাবি পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার কথা জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, খেলাফত মজলিসের এই কর্মসূচি দেশীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে। বিশেষত যখন নির্বাচন ও সাংবিধানিক সংস্কার নিয়েalready একটি সংবেদনশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তখন ধর্মনির্ভর রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের তৎপরতা সমান্তরালে রাজনৈতিক মঞ্চে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। অপরদিকে খেলাফত মজলিস বলছে তাদের দাবিগুলো কোনো একদলীয় বা সাম্প্রদায়িক স্বার্থে উত্থাপিত নয়; তারা দাবি করছে যে এসব সঙ্কটজনক ইস্যু দেশ-সমাজের সার্বিক স্বার্থে প্রাধান্য পাচ্ছে। সংগঠনটির নেতারা বারবার জোর দিয়েছেন যে তাদের আন্দোলন ঐক্যবদ্ধ, সাংবিধানিক এবং শান্তিপূর্ণ থাকার সিদ্ধান্তে অনড়।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া মিশ্র। সরকারি শিবিরের একাংশ বলছে, সংবিধান ও দেশের আইনি কাঠামো মেনে চললে যে কোনো দাবি আলোচনা করা যায়, কিন্তু সংসদীয় প্রক্রিয়া ও সার্বিক সুশাসন যাতে ব্যাহত না হয় তা নিশ্চিত করা হবে। বিরোধী শিবিরের মধ্যে কেউ কেউ খেলাফত মজলিসের এই কর্মসূচিকে সমর্থন করে বলছেন, জনগণের যে মৌলিক দাবি রয়েছে সেগুলো লক্ষ্য করা দরকার। তবুও বেশ কয়েকটি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল জনপ্রতিনিধিত্ব ও নাগরিক অধিকার রক্ষার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এবং অনুরোধ করেছেন যে আন্দোলন সুষ্ঠু ও আইনগত মাত্রায় সীমাবদ্ধ রাখা হোক।
আইন পেশার এক বিশেষজ্ঞ বলেন, রাজনৈতিক দাবিপূরণ ও সরকারকে স্মারকলিপি প্রদান স্বাধীনতা সংবাদমাধ্যম ও সমাবেশ-সংগঠনের অধিকারেই পড়ে; তবে কোন দাবি যদি সংবিধানবিরুদ্ধ হয় বা অন্যের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে, তা আইনগতভাবে বিবেচ্য হবে। তিনি আরও যুক্ত করেন, জনমত গঠন ও গণমঞ্চে দাবির উপস্থাপনা সুষ্ঠু থাকলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ, কিন্তু যদি সহিংসতা বা অগ্নিসংযোগের পথে কেউ যায়, তাহলে আইনি প্রতিকার গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে ধূসর রঙ ধারণ করছে, সেখানে সামাজিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা দ্বৈত। তারা জনগণের ন্যায্য দাবি তুলে ধরতে পারে, একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনগুলিকে দায়িত্বশীল ও সংহতভাবে কাজ করতে হবে যাতে সাম্প্রদায়িক ও নাস্তিক শক্তি দেশে অস্থিতিশ্তা না সঞ্চার করে। খেলাফত মজলিসের নেতারা এই উদ্বেগকে অস্বীকার করেছেন এবং বারবার বলেছেন যে তারা কোন গণতান্ত্রিক অধিকার অস্বীকারে আগ্রহী নয় বরং দেশের সার্বিক স্বার্থেই তাদের উদ্যোগ।
অভিনবতা আর প্রাসঙ্গিকতার দিক থেকে দেখা যায়, খেলাফত মজলিস এবারের কর্মসূচি রাজনীতি ও ধর্মের সংযোগকে সামনে নিয়ে আরও ব্যাপকভাবে সমাজের প্রতিটি স্তরে কাজ করার পরিকল্পনা করেছে। তাদের উদ্যোগে তরুণদের, কৃষক-শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে নিজেদের দাবির ন্যায্যতা উপস্থাপন করাই কেন্দ্রীয় লক্ষ্য। একই সঙ্গে তারা মনে করিয়ে দেয় যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদীয় নেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলাপের দ্বারও তারা খোলা রাখবে।
সংক্ষেপে বলা যায়, খেলাফত মজলিসের ঘোষিত পাঁচ দফা দাবির পক্ষে নতুন কর্মসূচি দেশীয় রাজনৈতিক মঞ্চে নতুন বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকার, বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ—তিনিই এই কর্মসূচির প্রতিফলন কিভাবে গ্রহণ করবে, তা আগামী কয়েক সপ্তাহে নিশ্চিত হবে। খেলাফত মজলিস বলছে, তাদের লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে জনগণের দাবি তুলে ধরা; অন্যদিকে সংশয়ে থাকা পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কর্মসূচি বাস্তবায়নের সময় আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর যে প্রভাব পড়বে, সেটিই নিরীক্ষণের বিষয় হবে।










