প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। নির্বাচনকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনে আরও দক্ষ ও পেশাদার হতে দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আইজিপি জানান, বাংলাদেশ পুলিশের মোট ২ লাখ ৩ হাজার সদস্যের মধ্যে প্রায় দেড় লাখকে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই দুই হাজারের অধিক সদস্যকে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করানো হয়েছে। তারা আবার সারাদেশে ১৩০টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অন্য সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেবেন। প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কৌশল এবং সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে।
বাহারুল আলম বলেন, “নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং এটি যেন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, সেটি নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। পুলিশ সদস্যরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়াচ্ছে যাতে ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন।” তিনি আরও বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে দেশের প্রতিটি জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে থাকবে।
বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে নিরাপত্তা সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা, সংঘর্ষ কিংবা সহিংসতার আশঙ্কা বরাবরই থাকে। এ কারণে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে তৎপর থাকে। তবে এবারের প্রস্তুতি যে কিছুটা ভিন্ন মাত্রায় হচ্ছে তা পুলিশের পদক্ষেপ থেকেই স্পষ্ট। বিশেষ করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যরা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠু রাখতে আরও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুতে শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নয়, বরং ভোটারদের সঙ্গে আচরণবিধি, মানবাধিকার রক্ষা এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা পালনের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ অবস্থায় নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
আইজিপি বাহারুল আলম তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচনকালে পুলিশের ভূমিকা হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। কোনো রাজনৈতিক দলকে প্রাধান্য দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “আমাদের মূল দায়িত্ব হবে জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষা দেওয়া। এজন্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ প্রস্তুত থাকবে।” তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে পেশাদারিত্ব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের ওপর নির্বাচনের সময়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে, ভোটকেন্দ্রে যেন শৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং প্রার্থী কিংবা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ না হয়—এসবই নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত পুলিশের ওপর বর্তায়। তাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ।
বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রেক্ষাপটে সহিংসতার ইতিহাস নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই সংঘর্ষ, হামলা, ভোটকেন্দ্রে দখল বা জালিয়াতির মতো অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশকে সবসময়ই কঠোর অবস্থান নিতে হয়। তবে এবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি পুলিশের দায়িত্ব হবে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু রাখা। এজন্য যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইতোমধ্যেই নির্বাচনি নিরাপত্তা পরিকল্পনায় পুলিশ ছাড়াও র্যাব, আনসার, কোস্টগার্ড ও অন্যান্য বাহিনীকে যুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। তবে মূল দায়িত্বের বড় অংশটাই পুলিশের কাঁধে বর্তাবে। আইজিপির ঘোষণা থেকে বোঝা যায়, মাঠপর্যায়ে পুলিশ একটি সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে যাচ্ছে।
নির্বাচনি প্রশিক্ষণের আরেকটি বড় দিক হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো হবে। বিভিন্ন জেলায় সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার পরিকল্পনাও চলছে। এর ফলে যেকোনো অনিয়ম বা সহিংসতা দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। প্রশিক্ষণে পুলিশ সদস্যদের এসব আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের বিষয়ে ধারণা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনি নিরাপত্তার এই উদ্যোগ ভোটারদের আস্থার সংকট কাটাতে সহায়ক হবে। কারণ ভোটাররা প্রায়শই আশঙ্কায় থাকেন যে সহিংসতার কারণে তারা ভোট দিতে পারবেন না। তবে যদি মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে এবার হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক নজর কাড়বে। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনের স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। সে ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বড় ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার এই উদ্যোগ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। আইজিপির ভাষায়, পুলিশের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি এবং দক্ষতা কাজে লাগানো হলে জনগণ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। দেশের গণতন্ত্রের শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।