প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
কুমিল্লার ঢাকা—চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে গত কয়েক মাস ধরে ঘনঘন সংঘটিত ঝটিকা মিছিল, তার সঙ্গে জড়িত আর্থিক লেনদেন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় সচেতন মহলের সঙ্গে আমাদের অনলাইন সংবাদদাতাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কিছু একক গোষ্ঠী পাল্টাপাল্টি অভিযানের মাধ্যমে মহাসড়কে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। অভিযোগ রয়েছে যে মিছিলে অংশগ্রহণ করানো হচ্ছে জনসাধারণকে জনপ্রতি দুই হাজার টাকার বিনিময়ে, এবং এই কার্যক্রমে আওয়ামী লীগের কয়েকজন পলাতক নেতার জড়িত থাকার কথা বলা হচ্ছে। এই ঘটনায় রাজনীতিক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে তলব তীব্রতর হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও আমাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত মহাসড়ক ঘেঁষে কিছু এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ–যুবলীগ প্রদর্শনীমূলক মিছিল ও অরাজকতার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এই যুক্তিতে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কয়েকজন নেতা, যদিও কয়েকজন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকে এখনও ধরা যায়নি। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা সভাপতি মিনহাদুল হাসান রাফির নাম বলা হলেও সাধারণ সম্পাদক ইসরাফিল পিয়াস প্রতিনিয়ত পলায়ন অবস্থায় রয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা এবং তাদের বিরুদ্ধে শক্তপ্রতিষেধক ব্যবস্থা নেওয়া না হওয়ায় স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক দলের তরফে প্রশাসনের প্রতি কড়া সমালোচনা ও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।
অভিযোগ করে বিএনপি-জামায়াত সমর্থক কয়েকজন স্থানীয় নেতা দাবি করেছেন যে, জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান পরিস্থিতিতে কুমিল্লায় দায়ের করা মামলাগুলোর প্রায় অর্ধেকের বেশি এখনও অনিকার্য রয়েছে। ওই মামলাগুলোর অচলাবস্থা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিলম্বকে নিয়ে তারা সরকারের অগ্রাহ্যতা ও কেন্দ্রীয় অভ্যন্তরীণ জটিলতা তুলে ধরছেন। এরই মধ্যে দলীয় অনুপ্রাণিত কিছু উপসর্গগত ঘটনা স্থানীয় জনজীবনে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আমাদের অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে দাবি যে জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মী কুমিল্লার কয়েকটি ভৌগোলিক এলাকাকে কার্যত দখল করে রেখেছেন। বুড়িচং উপজেলার আবেদপুর গ্রামসংকুল সেই তালিকার একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উল্লেখ্য। স্থানীয় দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই গ্রাম নিয়ে স্থানীয় স্তরে আধিপত্য রয়েছে এবং সেখানে বাইরে থেকে প্রবেশে বাঁধা সৃষ্টি হয় — কমিশনার বা তল্লাশি কার্যক্রম সীমিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বুড়িচং থানার ওসি মো. আজিজুল হক আমাদের জানিয়েছেন, ওই এলাকায় কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম রয়েছে, ফলে স্থানীয়ভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
ছাত্ররাজনীতির প্রভাব ও তার অর্থনৈতিক দিক নিয়ে কুমিল্লার রাজনৈতিক পরিবেশকে বিশ্লেষণ বিশেষজ্ঞরা দেখান যে, নির্বাচনী অঙ্গণে জনমন্ধ্যতা বাড়াতে এবং আঞ্চলিক শক্তি প্রক্ষেপণে নানা ধরনের কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ ইমরান আনসারী বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় রাজনৈতিক কর্মীরা সংগঠিত হয়ে অনুপ্রবেশকারী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তা দেশের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশি দেশের আশ্রয়ে থাকা ব্যক্তিদের ক্রমাগত পারস্পরিক যোগাযোগে লাগাম টানা কঠিন হলে সীমান্ত প্রশাসন ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে।
অন্যদিকে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতারা অভিযোগ করেছেন যে নিষিদ্ধ সংগঠনের ক্যাডারদের দ্রুত জামিনে ছাড় দেওয়া এবং রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারীদের সক্রিয়তা এই অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের নেতা কাজী জুবায়ের আলম জিলানী বলেন, কিছু ক্যাডার জনসাধারণকে অর্থ দিয়ে ভাড়া করে মহাসড়কে মিছিল করাচ্ছে, যা আমরা চালাবার সুযোগ দেব না। এখানকার মানুষের নিরাপত্তা ও লোক চলাচলের স্বাভাবিকতা বিরাটভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। স্থানীয় বিএনপির নেতারা প্রশাসনকে দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
আনসারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মন্তব্য ছাড়াও কুমিল্লার পুলিশের পক্ষ থেকে জানান হয়েছে যে প্রশাসন অরাজকতা প্রতিরোধে সজাগ রয়েছে। কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো. নাজির আহমেদ খান আমাদের বলেন, সীমান্তসহ যেকোনো জায়গায় অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর হাতে দমন করা হবে। গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা ছড়ালে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও যোগ করেন, মহাসড়কে মিছিল ও অনৈতিক কর্মসূচি সম্পর্কিত বেশ কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ রোহিগরি করে বলেছে, স্থানীয় পর্যায়ে বিস্তৃত সহায়তার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।
এই বিষয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা একে অপরের প্রতি অভিযোগ তোলায় বদ্ধপরিকর। কুমিল্লার স্থানীয় নেতা-অভিযোগকারীরা পরস্পরের ওপর রাজনৈতিকভাবে উস্কানিমূলক আচরণ চালাচ্ছেন বলে স্থানীয় মানুষজনের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ব্যবস্থা ও পণ্যের সরবরাহ চেইনে অনিয়ম দেখা গেছে।
স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং রাজনৈতিক দলগুলো একসাথে বসে পরিস্থিতির নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে অচিরেই নৈতিকতা পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে বিপুল বিরোধী পক্ষের দাবী। বিশেষ করে মহাসড়ক নিরাপত্তা, জনপরিবহন স্বাভাবিকতা রক্ষা এবং জনতাকে অর্থ অপব্যবহার থেকে বিরত রাখতে স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয়ভাবে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদের উচিত তাদের কর্মচারীদের শান্তি আনতে সচেতন করা এবং যে কোনো প্রকার অর্থের বিনিময়ে জনসমাগম আয়োজনের কাগজপত্র ও উৎস খতিয়ে দেখা।
অবশেষে বলা যায়, ঢাকা—চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে সংঘটিত ঝটিকা মিছিল ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের দুর্গন্ধ শুধু কুমিল্লার নয়, সমগ্র দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রশ্ন তোলে। আইন প্রবর্তক ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর উচিত এই ধরনের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত সুনিশ্চিত করা, যাতে সাধারণ মানুষের জীবন—জীবিকা ও পথচারীদের মৌলিক নিরাপত্তা পুনরায় নিশ্চিত করা যায়।










