প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের অন্যতম বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (আইবিবিএল) বর্তমানে ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। ব্যাংকটির এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া বিপুলসংখ্যক অদক্ষ ও অর্ধশিক্ষিত কর্মী। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত সাত বছরে এই কর্মীদের জন্য ব্যাংকটির ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ৮ হাজার ৩৪০ জনের বেশি মানুষকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষার প্রক্রিয়া ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন পানের দোকানদার, অটোরিকশা চালক, রাজমিস্ত্রির সহকারী, গৃহকর্মী ও বিভিন্ন অদক্ষ পেশার মানুষ। এসব মানুষকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়া হলেও তারা ব্যাংকিং পেশায় কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা না থাকায় ক্রমে প্রতিষ্ঠানের জন্য ভয়াবহ বোঝায় পরিণত হন।
অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, এই অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার জন্য প্রতি বছর প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে। ফলে সাত বছরে এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল অঙ্কের ক্ষতির কারণে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়েছে এবং গ্রাহক আস্থা মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছে। একইসাথে ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ লোপাটের অভিযোগও যোগ হয়েছে, যা সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইসলামী ব্যাংকের এ ধরনের অবৈধ নিয়োগ ও অর্থ আত্মসাতের কারণে কেবল প্রতিষ্ঠানটি নয়, বরং পুরো ব্যাংকিং খাত এক ভয়াবহ সঙ্কটের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি দ্রুত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয় তবে ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ কর্তৃক শুরু করা যোগ্যতা যাচাই প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে বহুজন জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে চাকরি নিয়েছেন। ইতিমধ্যে কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে প্রমাণ মিললে তাদের চাকরি বাতিল করা হয়েছে, তবে এ প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নেয় সম্প্রতি যখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য বিশেষ পরীক্ষা আয়োজন করে, অথচ অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী সেই পরীক্ষা বর্জন করেন। এ ঘটনা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের প্রতি তাদের সরাসরি অবাধ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, এসব কর্মী শুধু পরীক্ষা বর্জনেই থেমে থাকেননি, বরং ব্যাংক ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার, সংবাদ সম্মেলন এবং নানা ধরনের হুমকির পথ বেছে নিয়েছেন। শুক্রবার ভোরে ব্যাংকের সরকারি ফেসবুক পেজ হ্যাক হওয়াকে এদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এর পেছনে বাইরের প্রভাবশালী গোষ্ঠীরও ইন্ধন রয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এক পরিচালক মন্তব্য করেছেন, বিদ্রোহী কর্মীদের হাতে গ্রাহকের অর্থ কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই কর্মীদের প্রকাশ্য অবাধ্যতা প্রমাণ করছে যে ভল্ট বা ক্যাশ কাউন্টার পর্যন্ত সুরক্ষিত নয়। দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে প্রতিষ্ঠানটি এক ভয়াবহ সংকটে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
গত সাত বছরে এসব অবৈধ নিয়োগের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত ইসলামী ব্যাংক ধীরে ধীরে আঞ্চলিক চরিত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আসা কর্মীরাই অধিক প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন এবং অফিসে তারা সবসময় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন। বহু নির্দেশনার পরও তারা নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করেননি। এর ফলে গ্রাহক সেবার মান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ব্যাংকের সুনাম তলানিতে নেমে যায় এবং গ্রাহকদের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়।
মানবসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার সময়ে নিয়োগ পাওয়া এই কর্মীদের বেশিরভাগের কোনো পেশাগত দক্ষতা ছিল না। তারা এস আলমের ক্ষমতা ব্যবহার করে সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ মানতেন না। নিজেদের পছন্দের এলাকায় বদলির জন্য চাপ সৃষ্টি করতেন এবং যে কর্মকর্তারা নিয়মের মধ্যে আনতে চাইতেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে পোস্টিং বদলাতেন বা চাকরিতে ঝুঁকি তৈরি করতেন।
তিনি আরও জানান, এই কর্মকর্তারা এখনো আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। পুরো ব্যবস্থাপনা একপ্রকার আতঙ্কে আছে, কারণ তাদের কারণে জোনাল হেড থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিরাপদ বোধ করছেন না।
সম্প্রতি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন এক অনুষ্ঠানে বলেন, “এস আলম একাই পুরো ব্যাংক খাতকে ধ্বংস করেছেন।” তার এই মন্তব্যই প্রমাণ করে যে ইসলামী ব্যাংকের অবৈধ নিয়োগ ও অদক্ষ কর্মীদের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্যই গভীর সংকেত।
আপনি কি চান আমি এই সংবাদটিকে আরও বিস্তৃত করে ১২০০ শব্দের কাছাকাছি নিয়ে যাই, নাকি বর্তমান আকারই যথেষ্ট?