চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় এক ভারতীয় প্রতিবন্ধী নাগরিককে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পরে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাৎক্ষণিকভাবে তাকে গ্রহণে সাড়া না দেওয়ায় বিষয়টি নতুন জটিলতার সৃষ্টি করেছে।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় কয়েকদিন ধরে এক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে ঘোরাফেরা করতে দেখে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়। পরে স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিজিবি সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ভারতের বিহার রাজ্যের বাসিন্দা বলে পরিচয় দেন।
আটক ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। তার দুই হাতের কব্জি না থাকায় ধারণা করা হচ্ছে তিনি দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে জীবনযাপন করছেন। সীমান্ত এলাকায় তিনি ভিক্ষাবৃত্তি করছিলেন বলেও জানা গেছে।
বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিদেশি নাগরিককে পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
পরে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আটক ব্যক্তিকে স্থানীয় থানায় হস্তান্তর করা হয়। তার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আটক ব্যক্তিকে কয়েকদিন ধরেই সীমান্তবর্তী এলাকায় দেখা যাচ্ছিল। তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে হিন্দি ভাষায় কথা বলতেন এবং খাবার ও সাহায্য চাইতেন। তার আচরণে সন্দেহজনক কিছু না থাকলেও পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়।
গোমস্তাপুর থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তিনি ভারতীয় নাগরিক বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তার পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
সীমান্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মাঝে মধ্যেই পথভ্রষ্ট, মানসিকভাবে অসুস্থ বা অসহায় ব্যক্তিদের পাওয়া যায়। এ ধরনের ঘটনায় মানবিক বিবেচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নীতিমালা অনুসরণ করাও জরুরি।
আইনজীবীদের মতে, কোনো বিদেশি নাগরিক বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অন্য দেশে প্রবেশ করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ থাকলেও মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।
এদিকে স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আটক ব্যক্তির শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থসামাজিক অবস্থার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তার পরিচয় যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষজনের মতে, সম্প্রতি সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও পুশইন নিয়ে বিভিন্ন ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ফলে যে কোনো বিদেশি নাগরিককে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে বাড়তি সতর্কতা কাজ করছে।
বিজিবি জানিয়েছে, আটক ব্যক্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হতে পারে।
সব মিলিয়ে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে এক ভারতীয় প্রতিবন্ধী নাগরিককে আটক এবং তাকে ফেরত নিতে বিএসএফের অনীহা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি—উভয় বিষয়কেই নতুন করে আলোচনায় এনেছে। এখন আদালতের নির্দেশনা এবং দুই দেশের প্রশাসনিক যোগাযোগের ওপরই নির্ভর করছে তার ভবিষ্যৎ গন্তব্য।