সর্বশেষ :
১২ বছর ধরে অচল একটি সেতু, দুর্ভোগে কুড়িগ্রামের হাজারো মানুষ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত, আশাবাদ সরকারের বোয়ালমারীতে মাদক কারবারির সন্দেহে গণপিটুনি, ক্ষুব্ধ জনতার আগুনে পুড়ল প্রাইভেটকার এক মাসে চারবার ভূমিকম্প, বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত নাকি স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া? চীন থেকে যুদ্ধবিমান কিনতে পারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত আদালতের চীন সফরে সৌরবিদ্যুৎ চুক্তির সম্ভাবনা আওয়ামী লীগের মাঠে নামার সাহস নেই: জাহেদ তাজিয়া মিছিলে হামলার শঙ্কা নেই: ডিএমপি জনবল নিয়োগ দিচ্ছে ট্রাস্ট ব্যাংক, আবেদন করতে পারবেন সারা দেশের প্রার্থীরা

চীন থেকে যুদ্ধবিমান কিনতে পারে বাংলাদেশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • ১১ বার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীন থেকে ২৪টি জে-১০সিই মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের লক্ষ্য নিয়ে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দেয়নি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরকে ঘিরে এই প্রতিরক্ষা আলোচনার গুরুত্ব বেড়েছে। সোমবার শুরু হওয়া সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে একাধিক বৈঠকের কথা রয়েছে। সরকারি সূত্রের ভাষ্য, সফরের সময় যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে আলোচনা নতুন গতি পেতে পারে।

সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চলতি বছরের আগস্টের মধ্যে যুদ্ধবিমান ক্রয়ের চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের লক্ষ্য রয়েছে। তার দাবি, প্রতিটি জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি মার্কিন ডলার। তবে চূড়ান্ত দাম শুধু বিমানের দামে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, গ্রাউন্ড সাপোর্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি সার্ভিস প্যাকেজ যুক্ত হলে মোট ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

জে-১০সিই চীনের তৈরি এক ধরনের আধুনিক মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান। এটি আকাশ থেকে আকাশে যুদ্ধ, আকাশ থেকে ভূমিতে হামলা, প্রতিরক্ষা টহল এবং বিভিন্ন কৌশলগত মিশনে ব্যবহারযোগ্য। পাকিস্তান ইতোমধ্যে এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ যদি জে-১০সিই কেনে, তাহলে বিমানবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা আধুনিকীকরণে এটি বড় পদক্ষেপ হবে বলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে বর্তমানে চীনা উৎসের বিভিন্ন বিমান ও সরঞ্জাম রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে চীনের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর করে আসছে। তাই নতুন যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনাকে অনেকে সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে জে-১০সিইয়ের মতো আধুনিক যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা এবং অস্ত্র ব্যবস্থাপনায় বড় বিনিয়োগ দরকার হবে।

আলোচনার গতি বাড়াতে গত সপ্তাহে চীনের একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করেছে বলে জানা গেছে। বেইজিং সফরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা চীনের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন। সেখানে ক্রয় প্রক্রিয়া, অর্থায়ন পদ্ধতি, সরবরাহ সময়সূচি, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এই সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু সামরিক কেনাকাটার বিষয় নয়। এটি ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের বৃহত্তর কৌশলগত রূপান্তরের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনা প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের বৈঠকের পর একটি যৌথ ইশতেহার আসতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রের ধারণা। সেখানে দুই দেশের সম্পর্ককে “শেয়ার্ড ফিউচার” বা অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারিত্ব হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক বা যৌথ ঘোষণা সই হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এসবের মধ্যে সবুজ জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যান, মংলা বন্দর আধুনিকীকরণ, প্রশিক্ষণ, গণমাধ্যম সহযোগিতা, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত বিষয় থাকতে পারে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার আলোচনায় তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পও গুরুত্ব পেতে পারে। তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। তবে সরকার এখন বিদেশি ঋণের শর্ত, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নিজস্ব অর্থায়নের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। তাই চীন সফরে এ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হলেও তা কোন কাঠামোয় এগোবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।

মংলা সমুদ্রবন্দর আধুনিকীকরণ নিয়েও দুই পক্ষের আলোচনা এগোচ্ছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে মংলায় ১১০ একরের একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রস্তুত করার কথাও আলোচনায় আছে। সরকারি সূত্রের দাবি, আগে এই জমি ভারতের বিনিয়োগের জন্য বিবেচনায় ছিল এবং একটি মুম্বাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকও হয়েছিল। পরে সেটি বাতিল করে জমিটি চীনা বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

এর আগে চট্টগ্রামে একটি পৃথক চীনা শিল্প পার্ক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান সরকারের বড় অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। চীনের বড় উৎপাদন শিল্প বাংলাদেশে এলে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, ইলেকট্রনিকস এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে প্রতিরক্ষা চুক্তি ও বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ এমন এক ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। চীনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক দ্রুত গভীর হলে তা আঞ্চলিকভাবে বিশেষ করে ভারতের নজরদারিতে থাকবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, নদীর পানি, যোগাযোগ এবং মানুষের চলাচলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আবার চীন বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন অংশীদার এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বড় উৎস। তাই ঢাকা এখন বহুমুখী বা ব্যালান্সড পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের কথা বলছে। সরকারের লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ভারতের সঙ্গে আলাদা আলাদা স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখা।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পরিস্থিতি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং কূটনৈতিক কিছু ঘটনায় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেখা গেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে চীন থেকে আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা আঞ্চলিক কৌশলগত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। তবে সরকারপক্ষের ভাষ্য, প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা চাহিদার অংশ। এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিমান কেনা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত। শুধু বিমান কিনলেই সক্ষমতা তৈরি হয় না। দরকার দক্ষ পাইলট, উন্নত রাডার, অস্ত্র ব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ ঘাঁটি, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, সিমুলেটর এবং নিয়মিত আপগ্রেড। এসব ব্যয় চুক্তির মূল দামের চেয়েও বেশি হতে পারে। তাই চুক্তির অর্থনৈতিক বাস্তবতা, অর্থায়ন পদ্ধতি এবং জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ বিবেচনা করা জরুরি।

বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বৈত লক্ষ্য। একদিকে বিমানবাহিনীর সক্ষমতা আধুনিক করা। অন্যদিকে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন ব্যয়ের ভারসাম্য রাখা। বড় প্রতিরক্ষা কেনাকাটায় স্বচ্ছতা, সংসদীয় নজরদারি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জনগণের অর্থে কেনা প্রতিটি বড় সামরিক সরঞ্জাম দীর্ঘ সময়ের জন্য রাষ্ট্রের আর্থিক দায় তৈরি করে।

চীন সফরে যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে আলোচনার গতি, চীনা প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফর এবং প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের প্রেক্ষাপট ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিষয়টি নীতিগত অগ্রাধিকারের পর্যায়ে এসেছে। আগস্টের মধ্যে চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনার কথাও সংশ্লিষ্ট সূত্রে বলা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে চীন থেকে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও কূটনীতিতে বড় ঘটনা হতে পারে। এটি বিমানবাহিনীর আধুনিকীকরণে নতুন ধাপ যোগ করবে। একই সঙ্গে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে আরও কৌশলগত মাত্রা দেবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে মূল্য, শর্ত, রক্ষণাবেক্ষণ, অর্থায়ন, আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া এবং জাতীয় স্বার্থ গভীরভাবে বিবেচনা করা দরকার। কারণ প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু অস্ত্র কেনা নয়। এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘমেয়াদি পথ নির্ধারণ করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত