১২ বছর ধরে অচল একটি সেতু, দুর্ভোগে কুড়িগ্রামের হাজারো মানুষ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • ৩১ বার

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের মানুষের কাছে একটি ভাঙা সেতু এখন শুধুই অবকাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতীক নয়, বরং দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও অবহেলার এক নির্মম বাস্তবতা। প্রায় এক যুগ আগে ভেঙে যাওয়া একটি সেতুর কারণে আজও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন অন্তত ১২ গ্রামের বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সমস্যাটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, খালের মাঝখানে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভাঙা সেতুর অবশিষ্টাংশ। একসময় যেটি ছিল এলাকার মানুষের প্রধান যাতায়াত পথ, এখন সেটি পরিণত হয়েছে দুর্ভোগের প্রতীকে। দুই পাশের সংযোগ সড়ক বিলীন হয়ে যাওয়ায় সেতুটি কার্যত অচল হয়ে রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে খালের ওপর নির্মিত সেতুটি এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করেছিল। নির্মাণের পর মানুষ সহজেই উপজেলা সদর ও জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন। কিন্তু উদ্বোধনের কিছুদিন পরই বন্যার পানির চাপে সেতুর একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ধীরে ধীরে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, সেতুটি চালু থাকার সময় বাজার, স্কুল, হাসপাতাল এবং সরকারি অফিসে যাতায়াত অনেক সহজ ছিল। বর্তমানে গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েকগুণ বেশি পথ ঘুরতে হয়। এতে সময় ও অর্থ—দুইয়েরই অপচয় হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন স্কুল ও কলেজে যেতে অনেককে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হতে পারে না।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে পরিবারের সদস্যদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, কয়েকটি ক্ষেত্রে রোগী পরিবহনে বিলম্ব হওয়ায় জটিল পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে।

কৃষকরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এলাকার প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ হলেও কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন ব্যয় গুনতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক থাকলে এলাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হতে পারত। কিন্তু ভাঙা সেতুর কারণে অনেক ব্যবসায়ী বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, গত এক যুগে বিভিন্ন সময় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করে নতুন সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সমস্যাটি সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন একটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগের ছোট আকারের সেতুর পরিবর্তে এবার একটি দীর্ঘ ও টেকসই সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। খালের প্রকৃতি ও পানির প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে নতুন নকশা প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি কমে আসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন শুধু মানুষের যাতায়াত সহজ করে না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকা এমন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দ্রুত পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এবার আর শুধু আশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকবে না উদ্যোগ। বহু বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হবে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা গ্রামগুলো আবারও মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে।

এক যুগ ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকা এই সেতু যেন কেবল একটি কাঠামোর গল্প নয়; এটি হাজারো মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা এবং উন্নয়নের অপেক্ষার প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়, নতুন সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কত দ্রুত রূপ পায়।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত