রংপুরের চার খুনে ৮০ ফোনালাপ, মিলছে পরিকল্পনার ইঙ্গিত

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫৫ বার
রংপুরের চার খুনে ৮০ ফোনালাপ, মিলছে পরিকল্পনার ইঙ্গিত

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে গ্রেপ্তার দুই আসামির মধ্যে মোট ৮০ বার ফোনালাপের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কলের সময়, সংখ্যা এবং ধরন বিশ্লেষণ করে ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে তদন্তকারী সংস্থা।

সোমবার (৩১ আগস্ট) রাতে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, তদন্তের অংশ হিসেবে আসামিদের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র তদন্তকারীদের সামনে এসেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগের ১২ ঘণ্টায় সিদ্ধার্থ দাস তার দুটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে মুগ্ধ দাসের একটি নম্বরে ৩০ বার কল করেন। এসব কলের প্রতিটিই সিদ্ধার্থের দিক থেকে করা হয়েছিল। কলগুলোর বেশির ভাগের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। কোনো কোনো কল ১৩, ১৫ কিংবা ১৭ সেকেন্ডের মতো স্থায়ী হয়। আবার ২০ আগস্টের মধ্যে তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ একটি ফোনালাপের স্থায়িত্ব ছিল ৯৬ সেকেন্ড।

তদন্তকারীরা শুধু হত্যাকাণ্ডের আগের কয়েক ঘণ্টার যোগাযোগ নয়, আরও বিস্তৃত সময়ের কল রেকর্ডও বিশ্লেষণ করছেন। ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, ২২ আগস্ট সন্ধ্যা ৮টা থেকে পূর্ববর্তী ৮০ ঘণ্টার ফোনকলের তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে। এতে দুই আসামির সঙ্গে বাইরের আরও কয়েকজনের যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এসব ব্যক্তির পরিচয় কিংবা তাদের সঙ্গে আসামিদের কী ধরনের যোগাযোগ ছিল, সে বিষয়ে এখনই বিস্তারিত জানাতে চাইছে না পুলিশ।

তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ফোনালাপের ধারাবাহিকতা। হঠাৎ কোনো বিরোধ বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা থেকে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে, নাকি এর পেছনে আগে থেকেই কোনো পরিকল্পনা ছিল—কল রেকর্ড সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশের ধারণা, ঘটনাটি আকস্মিক ছিল না; এর পেছনে পূর্বপরিকল্পনা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তদন্তে এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের সম্পৃক্ততার প্রমাণই পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বাইরের অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয়েছে—এমন তথ্য পুলিশ এখনো প্রকাশ করেনি।

চারজন মানুষের নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে হত্যার উদ্দেশ্য কী ছিল, আসামিরা কেন ওই বাড়িতে গিয়েছিল, তাদের সঙ্গে নিহত পরিবারের কোনো পূর্বপরিচয় ছিল কি না এবং হত্যাকাণ্ডের আগে তারা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।

ঘটনার তদন্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে আসামিদের ডোপ টেস্ট নিয়ে। গ্রেপ্তারের পর পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিল, ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গিয়েছিলেন। সেখানে গণপতি চক্রবর্তী তাদের দেখে বাধা দেওয়ার পর হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে আসামিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানিয়েছিল। এমনকি হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে তারা মোট নয়টি ইয়াবা সেবন করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছিল।

কিন্তু পরবর্তী ডোপ টেস্টে তাদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। আদালতের নির্দেশে রোববার রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে দুই আসামির প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করে পুলিশ। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে তাদের শরীরে কোনো মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন ডিবির কর্মকর্তারা।

তবে এই ফলাফলকে কেন্দ্র করে তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি হলেও এর মাধ্যমে আসামিদের আগের বক্তব্য সরাসরি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছায়নি পুলিশ। কারণ গ্রেপ্তারের প্রায় নয় দিন পর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু মাদক শরীরে থাকার সময়সীমা পেরিয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে প্রস্রাব পরীক্ষায় তা শনাক্ত নাও হতে পারে। ফলে পরীক্ষার ফলাফল ব্যাখ্যা করতে নমুনা সংগ্রহের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে দুই আসামিকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তিন দিনের রিমান্ড চেয়েছিল। তবে তারা এরই মধ্যে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনায় ছিল। এসব কারণে আদালত তিন দিনের রিমান্ডের পরিবর্তে দুই দিন জেলগেটে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন।

রংপুরের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে দুই দিন আসামিদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন। তদন্তকারীরা আশা করছেন, জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে আসামিদের গতিবিধি ও যোগাযোগের বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

গত ২২ আগস্ট রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ও শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন মুহূর্তের মধ্যে এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে পৌঁছানোয় ঘটনাটি স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে।

ঘটনার পর নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে নগরীর কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে মামলাটি কোতোয়ালি থানা থেকে মহানগর ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে।

মামলার তদন্ত এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে এগোচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, দুই আসামির সঙ্গে নিহত পরিবারের সম্পর্ক বা পরিচয় কতটা ছিল, ঘটনার আগে তাদের মধ্যে কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল এবং ফোনে পাওয়া বাইরের ব্যক্তিদের সঙ্গে আসামিদের যোগাযোগের প্রকৃতি কী ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিশেষ করে ৮০ বার ফোনালাপের তথ্য তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ হত্যাকাণ্ডের সময়ের কাছাকাছি সময়ে ঘন ঘন যোগাযোগের ঘটনা তদন্তকারীদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও শুধু ফোনালাপের সংখ্যা দিয়ে কোনো অপরাধের পূর্বপরিকল্পনা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করা যায় না। ফোনে কী আলোচনা হয়েছে, যোগাযোগের সময় আসামিরা কোথায় ছিলেন এবং এসব তথ্য অন্যান্য আলামতের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেগুলোই তদন্তের পরবর্তী ধাপে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের পাশাপাশি ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং আসামিদের জবানবন্দির তথ্যও মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের প্রতিটি তথ্য অন্য প্রমাণের সঙ্গে যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

রংপুরের এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডে ইতোমধ্যে দুই আসামির গ্রেপ্তার ও আদালতে জবানবন্দির পর তদন্ত কিছুটা এগোলেও ঘটনার পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। ৮০ ফোনালাপ, মাদক পরীক্ষার ফল এবং আসামিদের বক্তব্য—তিনটি বিষয়কে পাশাপাশি রেখে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে পুলিশ। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য কিংবা অন্য কারও সম্পৃক্ততা নিয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

তবে পুলিশের হাতে উঠে আসা নতুন ফোনালাপের তথ্য মামলাটির তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই যোগাযোগের পেছনে কী ছিল এবং চারজন মানুষের প্রাণহানির সঙ্গে এর কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম বড় প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর মিললেই রংপুরের এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের রহস্য আরও স্পষ্ট হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com