প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম আলোচিত বিষয় হচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে যেমন আলোচনা হয়েছে, তেমনি সমালোচনাও হয়েছে কম নয়। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
বিবিসি বাংলার সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান দেশের স্বার্থ, ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক নীতি, ফেলানি ইস্যু, পানিবণ্টন এবং চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত মতামত দেন। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকেই যে সর্বাগ্রে রাখবেন, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
তারেক রহমান বলেন, “সবার আগে বাংলাদেশ। আমি আগে দেশের স্বার্থ, বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ দেখব। সেটাকে ভিত্তি করেই আমরা সামনে এগোব।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক অধিকার প্রশ্নে কোনো আপস নয়। তার বক্তব্যে একদিকে যেমন কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রতিশ্রুতি ছিল, অন্যদিকে দেখা গেছে দৃঢ় জাতীয়তাবাদী মনোভাবের প্রতিফলন।
সাক্ষাৎকারে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় গেলে পারস্পরিক সম্মান ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন এক ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক নীতি গ্রহণ করবে। “আমরা বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু সে বন্ধুত্ব যেন হয় সমমর্যাদার ভিত্তিতে,” বলেন তিনি।

তারেক রহমান ফেলানির মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “আমি দেখতে চাই না, আরেক ফেলানি ঝুলে আছে। আমার দেশের মানুষের ওপর আঘাত আসলে সেটাকে আমরা কখনো সহজভাবে নেব না।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি প্রতিবেশী সম্পর্কের মানবিক ও ন্যায্যতার দিকটিকেও জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
ফেলানি হত্যার ঘটনার মাধ্যমে তিনি বুঝাতে চান, সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বাংলাদেশ মেনে নেবে না। তারেক রহমানের বক্তব্যে পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে— দেশের মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়টি যেকোনো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চেয়ে অগ্রগণ্য।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তবে সমালোচকরা মনে করেন, এই সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই ছিল একতরফা। ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন অনেক বিশ্লেষক। তারেক রহমানের বক্তব্যে তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু সেটি হবে সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে।
তিনি বলেন, “আমরা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই, কিন্তু সেটা যেন হয় ন্যায়, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ, আমাদের সিদ্ধান্ত আমরা নিজেরা নেব।”
বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়েও তারেক রহমান মন্তব্য করেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে দিল্লির কূটনৈতিক যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে শীতল। ভারতের সরকারি পর্যায়ের অবস্থানও অনেকটা নীরব।
এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, “ভারত যদি স্বৈরাচারকে আশ্রয় দেয়, আর সেই কারণে বাংলাদেশের মানুষ যদি তাদের প্রতি বিরাগভাজন হয়, তাহলে সেটি ভারতের নিজেদের তৈরি করা সমস্যা। আমাদের কিছু করার নাই। বাংলাদেশের জনগণই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল থাকবে।”
তার এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, বিএনপি সরকার ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, তবে সেটা জনগণের অনুভূতির প্রতিফলন ও ন্যায্য কূটনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। তিনি বলেন, “যে সম্পর্ক জনগণের স্বার্থে নয়, সেটি টেকসই হতে পারে না।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রধান ইস্যুগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, ও ট্রানজিট সুবিধা। এসব প্রশ্নে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তারেক রহমান এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্টভাবে জানান, বিএনপি সরকার এ ধরনের অসমতা দূর করতে ন্যায়সঙ্গত ও শক্ত অবস্থান নেবে।
তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশের হিস্যা চাই—হোক সেটা নদীর পানি, অর্থনৈতিক সুযোগ বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ন্যায্য অংশীদারিত্ব। আমাদের দেশ কারও দয়ার ওপর নির্ভর করবে না।”
তারেক রহমানের বক্তব্যে লক্ষ্য করা যায়, বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে শত্রুতার জায়গা থেকে না দেখে, বরং সম্মানজনক ও বাস্তবসম্মত বন্ধুত্বের জায়গায় স্থাপন করতে চায়। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, কূটনীতি হবে ভারসাম্যপূর্ণ—যেখানে প্রতিবেশী বন্ধুত্ব থাকবে, তবে জাতীয় স্বার্থই হবে মূল চালিকাশক্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিএনপি তাদের আন্তর্জাতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে চেয়েছে। অতীতে দলের প্রতি যে অভিযোগ ছিল—ভারতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার, সেই ধারণা বদলে একটি বাস্তববাদী চিত্র তুলে ধরতে চেষ্টা করছে তারা।

তারেক রহমানের বক্তব্যে দেখা যায় এক নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদা ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা মিলেমিশে এক হয়েছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষাই আমার প্রথম দায়িত্ব। বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু মাথা নত করে নয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই বার্তা শুধু ভারতের জন্য নয়, বরং পুরো আন্তর্জাতিক সমাজের জন্যও একটি সংকেত—বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে, তবে তাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বদেশকেন্দ্রিক।
তারেক রহমানের এই সাক্ষাৎকারে যেমন স্পষ্ট হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার, তেমনি প্রতিফলিত হয়েছে তার কূটনৈতিক পরিপক্বতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে বড় শক্তিগুলোর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে, সেখানে তার এই বার্তা বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার নতুন এক দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সবশেষে তারেক রহমানের বক্তব্যে যে মূল সুরটি প্রতিধ্বনিত হয়েছে তা হলো— বাংলাদেশের আগে কিছু নয়, দেশের মানুষের মর্যাদা ও স্বার্থই হবে সব নীতির কেন্দ্রে।