প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক বিতর্কের সূচনা করেছে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। সম্প্রতি তারা “জুলাই সনদ” বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জনগণের সম্মতি যাচাইয়ের জন্য গণভোট আয়োজনের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। দলটির প্রস্তাব অনুযায়ী, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে—যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত সোমবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন পায়। বৈঠকে ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের বিষয়ে কমিটির সদস্যদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং সবাই একমত হন যে, জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সর্বশেষ বৈঠকের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গণভোটের প্রস্তাব এসেছে কমিশনের বিভিন্ন সদস্যের পক্ষ থেকেও। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি মনে করছে, গণভোট আয়োজন করা হলে তা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং সাংবিধানিকভাবেও বৈধ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
স্থায়ী কমিটি তাদের অভিমতে জানায়, সরকার চাইলে অধ্যাদেশ জারি করে কিংবা নির্বাচন সম্পর্কিত আইন আরপিওতে (Representation of the People Order) সংশোধনী এনে নির্বাচন কমিশনকে গণভোট পরিচালনার ক্ষমতা দিতে পারে। এতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট আয়োজন করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে একই ভোটকেন্দ্র, একই দিন, একই প্রশাসনিক কাঠামো এবং একই লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় কাজ সম্পন্ন করা গেলে সময় ও অর্থ—দুটিই সাশ্রয় হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা আরও বলেন, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলে জনগণকে ভোটকেন্দ্রে একাধিকবার যেতে হবে না, ফলে অংশগ্রহণের হারও বাড়বে। তারা মনে করেন, এই উদ্যোগ জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটাতে সাহায্য করবে এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে বৈঠকে কিছু সতর্ক মতও উঠে আসে। আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু রাজনৈতিক দল যে সংসদ নির্বাচনের আগেই গণভোট আয়োজনের দাবি তুলেছে, সেটি নিয়েও মতবিনিময় হয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটি মনে করে, নির্বাচনের আগে গণভোটের মতো বিশাল আয়োজন বাস্তবায়ন করা সময়সাপেক্ষ এবং এতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের দিন একসঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হলে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে, একইসাথে জনগণও বিভ্রান্ত হবে না।
দলটির একাধিক নেতা বলেন, স্থানীয় সরকার, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনগণ একাধিক ব্যালটে ভোট দিতে অভ্যস্ত। সুতরাং সংসদ নির্বাচনের সময় দুটি ব্যালট ব্যবহার করলে জনগণের কোনো বিভ্রান্তি হওয়ার আশঙ্কা নেই। বরং এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিধিকে আরও বিস্তৃত করবে।
এদিকে বিএনপির এই প্রস্তাব রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গণভোট আয়োজনের ধারণা একদিকে যেমন জনগণের মতামতকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে এটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে—যেখানে দলটি নিজেদের দাবি ও অবস্থানকে গণআন্দোলনের রূপ দিতে চাইছে।
বৈঠকে বিএনপির আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় প্রস্তুতির বিষয়েও আলোচনা হয়। জানা গেছে, প্রার্থিতা চূড়ান্তকরণ ও প্রাথমিক মনোনয়ন প্রক্রিয়া চলতি মাসের মধ্যেই সম্পন্ন হবে। দলটি এবার প্রার্থি বাছাইয়ে যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি বিবিসি বাংলায় তারেক রহমানের দেওয়া সাক্ষাৎকার নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তার বক্তব্যের প্রশংসা করে বলেন, “তারেক রহমান যে বিষয়গুলো সেখানে তুলে ধরেছেন—বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও অর্থনীতিতে ন্যায্যতার প্রশ্ন—এসব এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।”
তারা মনে করেন, তারেক রহমানের বক্তব্য বিএনপির রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করছে এবং এতে জনগণের মধ্যে দলের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “তার এই সাক্ষাৎকার দেশের গণতন্ত্র পুনর্গঠনের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির এই গণভোট প্রস্তাব মূলত দলটির দীর্ঘদিনের দাবি “জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি”র বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে জুলাই সনদে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সংসদীয় সংস্কারের পুনর্বিন্যাস এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা—এগুলো বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের পথ বেছে নেওয়া দলটির কৌশলগত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, সরকারি মহল এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণভোট আয়োজন করতে হলে প্রথমে সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকার যদি নির্বাচন কমিশনকে এই ক্ষমতা দিতে চায়, তাহলে এর জন্য প্রয়োজন আইনগত সংশোধনী বা অন্তত একটি অধ্যাদেশ জারি। ফলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটি মনে করে, সরকার যদি সত্যিই জনগণের মতামত জানতে আগ্রহী হয়, তাহলে তাদের উচিত নির্বাচন কমিশনকে গণভোট পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা। এতে জনগণের ভোটাধিকার আরও শক্তিশালী হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে।
এ প্রস্তাব এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বিএনপির এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে, আবার কেউ কেউ এটিকে নির্বাচনী কৌশল হিসেবেও দেখছেন।
যাই হোক, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে, সামনে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে—আর এমন সময়ে গণভোটের মতো একটি বড় গণতান্ত্রিক উদ্যোগের আলোচনায় আসা নিঃসন্দেহে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে নতুনভাবে আলোড়িত করেছে।