প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) নিলামের মাধ্যমে আরও ১০ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এই পরিমাণ ডলার কেনা হয়, যা সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারাবাহিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, বাজারে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ডলারের সরবরাহ বেড়ে গেছে। রপ্তানিকারক ও প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় এবং বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখতে গত জুলাই থেকে নিয়মিতভাবে ডলার কেনা হচ্ছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারের বাস্তব চিত্র পর্যবেক্ষণ করে ডলারের লেনদেন পরিচালনা করছে। সরবরাহ বেড়ে গেলে ডলার কেনার মাধ্যমে বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা হচ্ছে, যাতে হঠাৎ দরপতন না ঘটে।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার কেনা ১০ কোটি ৭০ লাখ ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ (এফএক্স) নিলাম কমিটির মাধ্যমে মাল্টিপল প্রাইস অকশন পদ্ধতিতে কেনা হয়। ওই নিলামে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২১ টাকা ৮০ পয়সা।
এর আগে, জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত মোট ২০৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ক্রয় কার্যক্রম মূলত বাজারে ডলারের অতিরিক্ত সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একদিকে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রক্ষা করছে, অন্যদিকে প্রবাসী আয়কারীদেরও উৎসাহিত করছে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে।
গত কয়েক মাসে একাধিক ধাপে ডলার কেনার রেকর্ড তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৩ জুলাই ১৮টি ব্যাংক থেকে ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার কেনা হয়। এরপর ১৫ জুলাই একই দরে কেনা হয় আরও ৩১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ২৩ জুলাই ১২১ টাকা ৯৫ পয়সা দরে কেনা হয় এক কোটি ডলার। এরপর আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েক দফায় ডলার কেনা হয়—যার মধ্যে ৭ আগস্ট ৪ কোটি ৫০ লাখ, ১০ আগস্ট ৮ কোটি ৩০ লাখ, ১৪ আগস্ট ১৭ কোটি ৬৫ লাখ, ২৮ আগস্ট ১৪ কোটি ৯৫ লাখ, ২ সেপ্টেম্বর ৪ কোটি ৭৫ লাখ, ৪ সেপ্টেম্বর ১৩ কোটি ৪০ লাখ, ৯ সেপ্টেম্বর ২৬ কোটি ৫০ লাখ, ১৫ সেপ্টেম্বর ৩৫ কোটি ৩০ লাখ, ২২ সেপ্টেম্বর ১২ কোটি ৯০ লাখ এবং সর্বশেষ ৬ অক্টোবর ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার কেনা হয়।
এই ধারাবাহিক কেনাকাটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধীরে ধীরে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ ঘাটতি মোকাবিলায় বাজারে ডলার বিক্রি করছিল, সেখানে এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রপ্তানি আয়ের বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় প্রবাহের স্থিতিশীলতা এবং আমদানি ব্যয়ের নিয়ন্ত্রিত প্রবণতা মিলে বাজারে ডলারের প্রাপ্যতা বেড়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ক্রেতার ভূমিকায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই নীতি মূলত দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনার অংশ। ডলারের অতিরিক্ত সরবরাহ থাকলে তা কিনে রাখলে বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী হয়। এই অর্থ পরবর্তীতে প্রয়োজনে বাজারে ছাড়া যাবে, যখন আমদানি ব্যয় বাড়বে বা ডলারের ঘাটতি দেখা দেবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপটি “প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং আগাম পরিকল্পিত”। অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, “আগে যখন ডলার ঘাটতি হতো, তখন হঠাৎ বিক্রি করে বাজার সামাল দিতে হতো। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক কৌশলগতভাবে বাজারে প্রবেশ করছে—চাহিদা বেশি হলে বিক্রি, সরবরাহ বেশি হলে ক্রয়। এই নমনীয় নীতি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। তবে এটিকে স্থায়ীভাবে কার্যকর রাখতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “যদিও ডলার কেনায় রিজার্ভে সাময়িক বৃদ্ধি দেখা যাবে, তবে এটি রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে যেন ব্যাংকগুলোর তারল্য সঙ্কট না হয় এবং তারা পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে সক্ষম থাকে।”
অন্যদিকে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপে তারা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে ডলারের দাম নিম্নমুখী থাকায় অনেক ব্যাংক অতিরিক্ত ডলার ধরে রেখেছিল, যা বিক্রি করতে পারছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রয় কার্যক্রমে তারা এখন সেই ডলার বিক্রি করতে পারছে, ফলে তারল্য ঘাটতি কমছে এবং বাজারে ভারসাম্য আসছে।
তবে কিছু অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, ডলার কেনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থ ব্যবস্থাপনা। কারণ বাজারে অতিরিক্ত টাকা ঢুকলে তা মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মনিটারি নীতির ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “আমরা বাজারের প্রতিটি সূচক নজরে রাখছি। আমাদের লক্ষ্য কেবল ডলার কেনা নয়, বরং একটি স্থিতিশীল আর্থিক পরিবেশ তৈরি করা। রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে দেশের আমদানি, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে আস্থা বৃদ্ধি পায়।”
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন বাংলাদেশ অর্থনীতির জন্য এক ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করছে। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, জ্বালানি মূল্যের ওঠানামা ও আমদানি নির্ভরতার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই রিজার্ভই হচ্ছে সরকারের প্রধান ভরসা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধারাবাহিক ক্রয়নীতি বজায় থাকলে আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশ আরও স্থিতিশীল আর্থিক অবস্থায় প্রবেশ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন ডলার কেনা কার্যক্রম তাই কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়—এটি দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার প্রতীক, যেখানে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক আস্থা এবং ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ রিজার্ভ গঠনের প্রতিফলন ঘটেছে।