৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচন, শিবির বনাম ছাত্রদল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৩ বার
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচন

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন হতে যাচ্ছে ১৬ অক্টোবর। তিন দশকেরও বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ক্যাম্পাসজুড়ে এখন উচ্ছ্বাস, প্রত্যাশা আর রাজনৈতিক উত্তেজনার মিশ্র আবহ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন করে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের আগ্রহ, আর বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন মাঠে নামিয়েছে তাদের প্রার্থীদের। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচনায় রয়েছে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির, দুই সংগঠনই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ছাত্রদল যেখানে ‘ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশায়’ মাঠে নেমেছে, সেখানে জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছাত্রশিবির।

রাকসুর এবারের নির্বাচনে মোট পদ রয়েছে ২৩টি—এর মধ্যে আটটি সম্পাদক, আটটি সহসম্পাদক ও চারটি কার্যকরী পদ। সিনেট ছাত্রপ্রতিনিধি নির্বাচনে পাঁচটি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৫৮ জন প্রার্থী। এছাড়া ১৭টি হল সংসদে ১৫টি করে মোট ৫৯৭ জন প্রার্থী লড়ছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ২৮ হাজার ৯০১ জন শিক্ষার্থী এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটিই হবে সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ ছাত্র সংসদ নির্বাচন।

সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাকসু নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না পেয়ে ছাত্রদল এবারের রাকসুতে ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। সংগঠনটি ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ নামে একটি বৈচিত্র্যময় ও গ্রহণযোগ্য প্যানেল ঘোষণা করেছে, যাতে বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের ও প্রভাবশালী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্যানেল ঘোষণা করা হয়।

প্যানেল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবার তারা প্রার্থি বাছাইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে রয়েছেন জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড়, রাজশাহী ফুটবল দলের গোলকিপার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী, ব্যান্ড সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় কয়েকজন। প্যানেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, নারী নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্তি—শীর্ষ তিন পদের একটিসহ মোট চারটি পদে নারী প্রার্থী রয়েছে, যা একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করছে।

ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) পদে প্রার্থী হয়েছেন শেখ নূর উদ্দিন আবীর, যিনি তার নম্র স্বভাব, সহজ-সরল আচরণ এবং ইতিবাচক নেতৃত্বের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ইতিমধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নাফিউল জীবন, যিনি ক্যাম্পাসে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েও সংগঠন থেকে সরে আসেননি। সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে রয়েছেন জাহিন বিশ্বাস এষা, যিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ এবং নারী শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য।

জিএস প্রার্থী নাফিউল জীবন বলেন, “ডাকসু ও জাকসুর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। এবার আমরা নতুন উদ্যমে এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা নিয়ে রাকসু নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য—রাজনীতিকে ইতিবাচক ও অংশগ্রহণমূলক ধারায় ফিরিয়ে আনা।”

ভিপি প্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবীর বলেন, “রাকসু নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ঢাবি বা জাহাঙ্গীরনগরের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনীয় নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিকতা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য আলাদা। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষার্থীদের আস্থা ও সমর্থন আমাদের পক্ষেই থাকবে। যদিও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেক সময় ‘শিবিরের ক্যান্টনমেন্ট’ বলা হয়, বাস্তবে এখানে নানা মতাদর্শের শিক্ষার্থীরা সহাবস্থান করছে। আমরা সেই বহুত্ববাদের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই।”

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব ধরে রাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরও এবারের রাকসুতে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। সংগঠনটি ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ নামে একটি নতুন প্যানেল ঘোষণা করে সবাইকে চমকে দিয়েছে। এই প্যানেলে শুধুমাত্র ভিপি পদে রয়েছেন রাবি ছাত্রশিবির সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, আর বাকি পদগুলোতে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সংগঠন, শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব।

জিএস পদে আছেন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা এবং এজিএস পদে রয়েছেন ‘সোচ্চার স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক’-এর সভাপতি সালমান সাব্বির। প্যানেলে তিনজন নারী প্রার্থী রয়েছেন, এছাড়া নির্বাহী সদস্যপদে একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছেন জুলাই আন্দোলনে চোখ হারানো শিক্ষার্থী দ্বীপ মাহবুব, যিনি এই প্যানেলে প্রতীকী প্রতিরোধ ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে জায়গা পেয়েছেন।

এই প্যানেলের অন্যতম মুখ সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক প্রার্থী জাহিদ হাসান জোহা। তিনি প্রচারণায় এনেছেন অভিনব পদ্ধতি—গম্ভীরা গানের সুরে তিনি কখনো কৃষক, কখনো শিক্ষক, আবার কখনো গায়ক সেজে শিক্ষার্থীদের সামনে হাজির হচ্ছেন। তার এই সৃজনশীল প্রচারণা ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং শিবিরের প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, শিবিরের একটি স্থায়ী ভোট ব্যাংক রয়েছে, যার সংখ্যা আনুমানিক সাড়ে চার হাজার। পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত সমর্থনের কারণে ছয়টি নারী হলের ভোটারদের বড় অংশও শিবিরের দিকে ঝুঁকতে পারে। রাজশাহীর সামাজিক গঠন ও আবাসিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যার ভিত্তিতে অনেকেই বলছেন, ভোটের মাঠে শিবির এখনো একটি শক্ত প্রতিপক্ষ।

‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’-এর ভিপি প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা যে বার্তা দিয়েছেন, তা হলো—তারা পরিবর্তন চান। আমরা সেই পরিবর্তনের প্রতীক হতে চাই। শিক্ষার্থীরা সৎ, যোগ্য ও সাহসী নেতৃত্ব চায়, আমরা সেই নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।”

তিনি আরও বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেউ কেউ শিবিরের ঘাঁটি বলে। কিন্তু আমরা সেই দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করি না। কারণ, এখানে সব মতাদর্শের শিক্ষার্থীরাই আছে, এবং সবাই আমাদের সমান সম্মান পায়। আমরা নারী শিক্ষার্থী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়েও কাজ করতে চাই।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রাকসুতে আমরা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সমস্যাগুলো শুনে তা সমাধানের জন্য কাজ করব। আমাদের ইশতেহারে নিরাপদ ও অংশগ্রহণমূলক ক্যাম্পাস গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকবে। আমরা চাই, রাজনীতি হোক মুক্ত চিন্তার, নয় ভয় ও দমননীতির। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।”

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ততটাই উচ্ছ্বাসে ভরে উঠছে। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার, ব্যানার আর রঙিন প্রতিশ্রুতির বন্যা। ক্যাম্পাসের আড্ডায়, ক্যান্টিনে কিংবা ডিপার্টমেন্টের করিডরে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু রাকসু নির্বাচন। তিন দশক পর শিক্ষার্থীরা আবার ভোট দিতে পারবে—এটাই তাদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

অবশেষে, ১৬ অক্টোবরের সেই বহুল প্রতীক্ষিত দিনটি আসছে, যেদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিনিধি নিজেরাই নির্বাচিত করবেন। কারা জয়ী হবেন তা সময়ই বলে দেবে, তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই নিশ্চিত—এই নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত