প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ অনলাইন ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী বাছাইয়ের খসড়া তালিকা প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের নয়টি বিভাগে ভাগ করে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রার্থীদের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা ও সাক্ষাৎ শেষে একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। এ প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত রয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির শীর্ষ পাঁচ নেতা।
দলের দায়িত্ব বণ্টন অনুযায়ী, তারেক রহমান তত্ত্বাবধান করছেন ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিলেট ও খুলনা বিভাগ, নজরুল ইসলাম খান রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন কুমিল্লা ও বরিশাল বিভাগ এবং সালাহ উদ্দিন আহমেদ ময়মনসিংহ বিভাগের আগ্রহী প্রার্থীদের সঙ্গে কাজ করছেন। দলের একাধিক সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রার্থীর উপযুক্ততা, গ্রহণযোগ্যতা ও বিজয়ের সম্ভাবনা যাচাই করে প্রাথমিক তালিকা তৈরি হচ্ছে।
দলীয় নেতাদের মতে, বিএনপি এবার প্রার্থী বাছাইয়ে আগের চেয়ে আরও কাঠামোবদ্ধ ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে চায়। প্রাথমিক তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর তা স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে, সেখানেই প্রার্থিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে যোগ-বিয়োজন করা হবে। এরপর যুগপৎ রাজনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে আসন বণ্টন আলোচনা শেষে করা হবে চূড়ান্ত তালিকা। একাধিক নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে কারা মনোনয়ন পাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সরাসরি তারেক রহমানের ওপর।
প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, “দল গণতান্ত্রিক কাঠামোয় পরিচালিত হয়। প্রার্থীদের মধ্যে উৎসাহ, আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা থাকাটা স্বাভাবিক। যিনি সবচেয়ে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য মনে করা হবে, তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে এবং অন্যরা তাকে সহযোগিতা করবেন।”
দলের এক ভাইস চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, বিএনপির এবারের প্রার্থী তালিকায় তরুণদের প্রাধান্য দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দলটি মনে করছে, নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করতে পারলে ভোটের মাঠে ইতিবাচক বার্তা যাবে। প্রাথমিক খসড়ায় ইতোমধ্যেই একাধিক তরুণ ও সম্ভাবনাময় প্রার্থী অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগ্রহী প্রার্থীদের দলীয় নেতারা পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় সরকারের আসন্ন নির্বাচনের প্রতিও মনোযোগ দিতে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, যেসব আসনে একাধিক দাবিদার রয়েছেন, সেখানে পরাজিত প্রার্থীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তাদের অনেককে ভবিষ্যতে দলীয় নেতৃত্ব, পৌরসভা, উপজেলা বা মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য জানান, প্রার্থিতা নির্ধারণে এবার কয়েকটি ধাপ থাকবে। প্রথমে আগ্রহীদের নাম তালিকাভুক্ত করা হবে, পরে স্থায়ী কমিটিতে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সেই তালিকা ছেঁটে নেওয়া হবে। এরপর যুগপৎ আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে যৌথ তালিকা তৈরি হবে। বিএনপি এরই মধ্যে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক জেএসডিকে তিনটি, গণসংহতি আন্দোলনকে একটি, নাগরিক ঐক্যকে দুটি, গণফোরামকে দুটি, ১২-দলীয় জোটকে পাঁচ থেকে ছয়টি আসন দেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা চালাচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
দলের ভেতরে আলোচনায় রয়েছে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে কৌশলগত অবস্থান। বিএনপি মনে করছে, বিরোধী আসনে জামায়াত যেন বড় কোনও অবস্থান না নিতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয়ের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, “দলীয় প্রক্রিয়া এখনো আলোচনার পর্যায়ে আছে। বিষয়টি সংসদীয় বোর্ডে উপস্থাপন করা হবে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের অনুমোদনক্রমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, “এখনো নির্বাচনী সমীকরণ পুরোপুরি তৈরি হয়নি। মাঠের বাস্তবতা, জোটের অবস্থান, সরকারের নির্বাচনকালীন নীতি—এসব বিবেচনায় আরও সময় লাগবে।”
বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক মনে করেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক পুনর্জন্মের সুযোগ। এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতায় ফেরার লড়াই নয়, বরং দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা, প্রার্থীর জনপ্রিয়তা এবং কৌশলগত দক্ষতা পরীক্ষারও ক্ষেত্র। তাই প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় এবার আগের চেয়ে বেশি সতর্ক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিচ্ছে বিএনপি।
সবশেষে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ আলোচনার সব ধাপ গোপন রাখা হবে। তবে যে প্রার্থীরা চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন, তাদের প্রচার কার্যক্রমে বিএনপি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের নেতারা এখন মাঠে সংগঠন পুনর্গঠনে ব্যস্ত সময় পার করছেন, এবং সেই প্রস্তুতিই বিএনপির ভবিষ্যৎ কৌশলের মূল ভিত্তি হয়ে উঠছে।