ভোটের লড়াইয়ে শেষমেষ কি জিতে যাবেন নারীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫২ বার
ভোটের লড়াইয়ে শেষমেষ কি জিতে যাবেন নারীরা

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে যাচ্ছে বিএনপি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি তাদের মোট প্রার্থীর অন্তত পাঁচ শতাংশ নারী নেত্রীকে সরাসরি মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে নারীর সীমিত অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের সুযোগ নিয়ে যে প্রশ্ন থেকে গেছে, এবার বিএনপি সেই কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে চায়। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশল নয়, বরং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে এগিয়ে নেয়ার এক বাস্তব প্রয়াস।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে অন্তত ১৫টির বেশি আসনে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন তরুণ ও উদ্যমী নারী নেতা রয়েছেন, যারা তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন। সংস্কার কমিশনেও দলটির পক্ষ থেকে সরাসরি ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের প্রস্তাব ইতোমধ্যেই গৃহীত হয়েছে। বর্তমানে শতাধিক নারী নেত্রী দেশের বিভিন্ন সংসদীয় আসনে গণসংযোগ ও প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।

নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বাংলাদেশে আগে থেকেই রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ৫০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে। তবে ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাব করা হয়েছিল, নারীদের সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ১০০ তে উন্নীত করার। যদিও বিএনপি তাদের প্রস্তাবে জানিয়েছে, বর্তমান নির্বাচনে তারা বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই অংশ নেবে, তবে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন থেকে সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নির্বাচন কমিশনের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার বিধান রয়েছে। এই লক্ষ্য ২০২০ সালের মধ্যে পূরণ করার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি, ফলে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা নিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের কৌশল অনুযায়ী মনোনয়ন দিয়ে থাকে।

দেশের নির্বাচন ইতিহাসে নারী প্রার্থীদের উপস্থিতি ক্রমে বাড়লেও তাদের সাফল্যের হার এখনও খুব বেশি নয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৩৯ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে নির্বাচিত হয়েছিলেন মাত্র ৫ জন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯-এ, আর ২০১৮ সালে ২২ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হন ১৯ জন নারী সংসদ সদস্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে এখনো নারী-পুরুষ সমতার বাস্তবায়ন অনেক দূরের বিষয়। পুরুষনেতৃত্বাধীন দলগুলোর ভেতরে নারীদের অগ্রগতি অনেক সময় বাধার সম্মুখীন হয়, যদিও নারী নেতৃত্বে দেশের শীর্ষ তিনটি পদে—প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা ও স্পিকার—একাধিক মেয়াদে নারীরাই দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, “আমাদের একক প্রার্থী চূড়ান্তের কাজ চলছে। আমরা চাই নারীদের ভূমিকা বাড়ুক। তাই আসন্ন নির্বাচনে মোট প্রার্থীর অন্তত পাঁচ শতাংশ নারী থাকবেন, যারা সরাসরি মাঠে ভোটে লড়বেন।” তার মতে, রাজনীতিতে নারীর সরাসরি অংশগ্রহণ দলীয় অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির এই সিদ্ধান্ত নারীর রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি সমাজে নারীর নেতৃত্ব নিয়ে যে পূর্বধারণা ছিল—যে রাজনীতি পুরুষদের কাজ, পরিবারই নারীর সীমা—এখন সেটি বদলে যাওয়ার সময় এসেছে। আজকের বাংলাদেশে নারী শুধু সংসার বা পেশায় নয়, রাজনীতিতেও নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন।

বিএনপির নারী নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, যিনি একসময় ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ। স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। নয় বছর ধরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নারীও হতে পারেন সংগ্রামী ও দূরদর্শী রাজনীতিক। আসন্ন নির্বাচনেও তিনি শারীরিকভাবে সক্ষম হলে একাধিক আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

বর্তমানে বিএনপির শতাধিক নারী নেত্রী সরাসরি ভোটে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল) আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফরিদপুর-২ আসনে মনোনয়ন চাইছেন প্রয়াত মন্ত্রী কেএম ওবায়দুর রহমানের কন্যা শামা ওবায়েদ। এছাড়া মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আলোচনায় আছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আফরোজা খানম রিতা, যিনি তার প্রয়াত পিতা হারুনুর রশিদ খান মুন্নুর আসন পুনরুদ্ধারে মাঠে সক্রিয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ ও নাটোর-১ আসনে মনোনয়ন চাচ্ছেন বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া। তিনি বলেন, “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিটি আন্দোলনে আমি ছিলাম, কারাবরণ করেছি, দলকে শক্ত করেছি। এবারও মনোনয়ন পেয়ে প্রমাণ করতে চাই যে, নারী রাজনীতির ময়দানে পুরুষের সমান সক্ষম।”

এদিকে হবিগঞ্জ-৪ আসনে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তরুণ নেত্রী শাম্মী আখতারের। তিনি বলেন, “আমরা চাই নারীরা শুধু সংরক্ষিত আসনে নয়, সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে সংসদে যেতে পারুক।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই সিদ্ধান্ত শুধু নির্বাচনী কৌশল নয়—এটি দেশের নারী সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। যদি দলটি তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি ও প্রভাব আরও দৃঢ় হবে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত