প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও দেখা দিয়েছে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা। শুক্রবার বিকাল চারটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বহুল আলোচিত “জুলাই সনদ ২০২৫”-এর স্বাক্ষর অনুষ্ঠান। কিন্তু অনুষ্ঠানের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সনদ স্বাক্ষরে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের সংগঠন—জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তাদের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে নতুন এক আলোড়ন।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (ইন্টেরিম) ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এই সনদকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কার ও নতুন সামাজিক চুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখছে। তবে এনসিপি বলছে, আইনি ভিত্তি ছাড়া এমন সনদ স্বাক্ষর “জুলাই ঘোষণাপত্রের” মতো আরেকটি একপাক্ষিক দলিলে পরিণত হবে।
শুক্রবার সকাল থেকেই সংসদ ভবন এলাকায় টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সকাল ১১টার দিকে দেখা যায়, অনুষ্ঠানের মঞ্চের সামনে অতিথিদের জন্য সাজানো আসনে বসে আছেন ‘জুলাই শহীদের পরিবার ও আহত’ ব্যক্তিরা। তারা নিজেদের দাবি আদায়ে দক্ষিণ প্লাজায় অবস্থান নিয়ে বসে পড়েন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝখানে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসদ ভবন এলাকায় ভিড় বাড়তে থাকে এবং পুলিশ সতর্ক অবস্থানে থাকে।
বৃহস্পতিবার রাত থেকেই উত্তেজনার সূত্রপাত। ঐ রাতেই এনসিপি আকস্মিকভাবে ঘোষণা দেয় যে তারা সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেবে না। দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক লিয়াঁজো প্রধান আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, “আমরা বহুবার বলেছি, জুলাই সনদের আগে আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে। এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান কেবল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এটি জুলাই ঘোষণাপত্রের মতো একতরফা পদক্ষেপে পরিণত হতে পারে, যা আমরা কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারি না।”
তিনি আরও জানান, ঐকমত্য কমিশন যেহেতু সময় বৃদ্ধি করেছে, তাই এনসিপি কমিশনের পরবর্তী প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবে। দাবি পূরণ হলে পরবর্তীতে তারা সনদে স্বাক্ষর করতে পারে। একই মত প্রকাশ করেছেন দলটির যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন। তার ভাষায়, “এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আইনি ভিত্তি অর্জনের কোনো সুযোগ তৈরি করবে না; বরং এটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমিত থাকবে। আমরা চাই, আইনি স্বীকৃতি নিশ্চিত করে তবেই এই সনদ কার্যকর করা হোক।”
এদিকে সরকার ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানটি জাঁকজমকভাবে আয়োজনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কমিশন ও সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এনসিপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তারা বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়েছে। এমনকি এনসিপির নেতাদের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা ও স্বয়ং ড. ইউনূসও যোগাযোগ করেন বলে জানা গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি।
কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা চাই সব দল একসঙ্গে বসে উৎসবমুখর পরিবেশে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করুক। তবে কোনো দল পরে যদি যোগ দিতে চায়, তারা সনদ প্রক্রিয়ার অংশীদার হিসেবেই বিবেচিত হবে।” তিনি আরও জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর যে খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে, শুক্রবারের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পর সেটিতে আর সংশোধনের সুযোগ থাকবে না।
কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা পবন চৌধুরী রাতে এক বিবৃতিতে জানান, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির শীর্ষ নেতাদের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে এই আমন্ত্রণ পৌঁছে দেওয়া হয়।
তবুও এনসিপির অনুপস্থিতি “জুলাই সনদ ২০২৫”-এর বাস্তবায়নকে এক অনিশ্চিত অধ্যায়ে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা এই তরুণদের অংশগ্রহণ ছাড়া সনদের সর্বজনগ্রাহ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাজনৈতিক মহল এখন তাকিয়ে আছে—শুক্রবারের নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠানটি আসলে অনুষ্ঠিত হয় কিনা, আর যদি হয়ও, তাতে কি এনসিপির স্বাক্ষর ছাড়াই নতুন রাজনৈতিক চুক্তি কার্যকর করা সম্ভব হবে?
বাংলাদেশের চলমান অন্তর্বর্তী রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত এই সনদ নিয়ে এখন গোটা দেশজুড়ে আগ্রহ, উৎকণ্ঠা ও বিতর্কের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।