বাংলাদেশে পুশ‑ইনের ভয়ে ভারতে ৯৫ বছরের বৃদ্ধের আত্মহত্যা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬০ বার
বাংলাদেশে পুশ‑ইনের ভয়ে ভারতে ৯৫ বছরের বৃদ্ধের আত্মহত্যা

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

কলকাতা — ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ইলামবাজার এলাকায় বৃহস্পতিবার সকালে এক ৯৫ বছর বয়সী বৃদ্ধের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তির নাম ক্ষিতিশ মজুমদার। তাঁর নাতনি ও অন্যান্য পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, তিনি চলমান নির্বাচনী ভোটার তালিকা সংশোধন ও বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগে ভোগছিলেন, এবং “বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে” এই ভয় থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনা মূলত চলমান ভোটার তালিকা সংক্রান্ত উত্তেজনা এবং পরিচয়‑শঙ্কার মধ্যে ঘটে থাকতে পারে। বীরভূম জেলার পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে দেহ উদ্ধার ও ময়নাতদন্তের পর ঘর থেকে পাওয়া হয়েছে সে ধরনের সন্দেহমূলক বার্তা, এবং “SIR‑চিন্তা” পরিলক্ষিত হয়েছে।

বিস্তারিত বললে, ঘটনা এ রকম – ক্ষিতিশ মজুমদার দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা থেকে ওই এলাকায় থাকছিলেন। তাঁর নাতনি নির্মলা মজুমদার জানান, “দাদার নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না। তিনি কয়েক বছর ধরে বলছিলেন, ‘যদি বাংলাদেশের দিকে ফিরে যেতে হয়, তাহলে আমার কী হয়?’” কারণ হিসেবে তিনি দাবি করেছেন, SIR‑র তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে এবং ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি না থাকলে ‘আউটসাইডার’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ভয় ছিল।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মজুমদারের দেহ বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর মেয়ের বাড়িতে পাওয়া গেছে। ওই বাড়ি ইলামবাজার থানার স্কুলবাগান সুবাশপল্লী এলাকায়। পরিবারের দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, “দাঁতে‑ দাঁতে বলছিলেন তিনি, তাঁর নাম তালিকায় নেই — ফলে হয়তো দেশে ফেরত পাঠানো হবে।” পুলিশ জানিয়েছে, তারা একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা (unnatural death case) রুজু করেছে।

এই ঘটনা একক নয়। গত কয়েক দিনের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ভোটার তালিকা ও SIR‑সংশ্লিষ্ট উদ্বেগের কারণ হিসেবে কমপক্ষে দু’টি আরও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, এক ৫৭ বছর বয়সী ব্যক্তি প্যানিহাটি (পশ্চিম ২৪ পরগণা) এলাকায় আত্মহত্যা করেছেন এবং তাঁর ডায়েরিতে লেখা পাওয়া গেছে, “NRC দায়ী আমার মৃত্যুর জন্য।” এছাড়া কোচবিহারে ৬৩ বছর বয়সী এক কৃষকও SIR‑ভয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।

এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে উঠলে একটি তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন, “আমরা দেখছি ভয়, বিভাজন ও ঘৃণার রাজনীতির ফল”; তাঁর মতে, “সতর্ক না হলে বৈধ নাগরিকদেরও ‘আউটসাইডার’ বানিয়ে দেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেছেন, “আমরা NRC বা SIRের নামে কোনও একেবারেই বৈধ মানুষকে বিদেশি হিসেবে বিবেচিত হতে দেব না।”

নিয়োন — বিস্তারিত অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ক্ষিতিশ মজুমদার দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম মেদিনীপুরে বসবাস করলেও বেশ কয়েক বছর তার মেয়ের বাড়িতেই ইলামবাজারে অবস্থান করেছিলেন। তাঁর পরিবারের দাবি, তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন কারণ নিজেকে “ভোটচলুচিত্রের বাইরেই” বলে অনুভব করছিলেন। রকারি বিবৃতি পাওয়া যায়নি যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ওই ব্যক্তির মৃত্যু SIR‑ভয়ে হয়েছে — শুধুমাত্র পরিবার‑পক্ষের দাবিই রয়েছে। পুলিশও জানাচ্ছে, “আমরা জানতে পেরেছি যে SIR নিয়ে আতঙ্কই আত্মহত্যার কারণ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনও লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।”

এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে একাধিক বিশেষ দিক বিবেচনায় আসছে। প্রথমত, বয়স, সামাজিক অবস্থা—৯৫ বছর বয়সে এমন ভয় এবং উদ্বেগের মধ্যে থাকা নিজেই যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয়। দ্বিতীয়ত, ভোটার তালিকা, এসআইআর এবং নাগরিকত্ব‑শেষ পর্যায়ে নিয়ে এই ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পার্শ্বপ্রভাব কীভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রবল মনস্তাত্বিক চাপ তৈরি করছে—এ বিষয় এখন গভীরভাবে মনোযোগ দাবি করছে। তৃতীয়ত, সীমিত তথ্য ও আত্মহত্যার পটভূমি খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, একটি দীর্ঘ স্থায়ী উদ্বেগ, পরিচয়ের অনিশ্চয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা একসাথে মিলিত হলে ব্যক্তি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব বহন করে কারণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বহুল সংখ্যক মানুষ রয়েছে যাদের বসবাস ও পরিচয়‑প্রমাণ নিয়ে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় বাংলা ভাষাভাষী অভিবাসী‐প্রবণ শ্রেণি, বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবার‑গোষ্ঠী এসব প্রক্রিয়ার কারণে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। পরিবার‑পক্ষে জানান, মজুমদারও “পালিয়ে যেতে হবে” এমন ভয়ে ছিলেন এবং ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এই উদ্বেগে ছিলেন।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়ঃপ্রাপ্ত এবং নাতিদীর্ঘ সামাজিক সংশয়ভোগীদের ক্ষেত্রে পরিচয়‑সহিত প্রক্রিয়া থেকে সৃষ্ট উদ্বেগ প্রকৃতপক্ষে সুস্থ্যতা ব্যাহত করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ভয়, অনিশ্চয়তা এবং উন্মুক্ত সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে পরিত্যক্ত ভাবনায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এই দৃষ্টিতে এই ধরনের ঘটনায় প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে — শুধু ঘটনা নিয়ে তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া নয়, তার পিছনের কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

উপসংহারে বলা যায়, ইলামবাজারের এই নিহত বৃদ্ধের ঘটনা শুধুই একদফা আত্মহত্যার বিষয় নয়; এটি ভারতের রাজ্য‑প্রশাসনের ভোটার তালিকা সংশোধন ও SIR‑পুর্ববর্তী রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে সাধারণ মানুষের ভয়, পরিচয়ের অনিশ্চয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার এক চিত্র। প্রশাসন ও রাজনৈতিক পক্ষ‑উভয়কেই এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com