দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব সীমিত, হেজেমনিক রাষ্ট্র হতে ব্যর্থ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫২ বার
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব সীমিত, হেজেমনিক রাষ্ট্র হতে ব্যর্থ

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রভাব নিয়ে সমালোচনা করে দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেছেন, বহু চেষ্টা সত্ত্বেও ভারত কখনোই এই অঞ্চলে হেজেমনিক বা প্রভুত্ববাদী শক্তিতে পরিণত হতে পারেনি। বাংলাদেশসহ শুধু কয়েকটি দেশকে ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো রাষ্ট্র ভারতের কর্তৃত্ব মেনে চলে না। তিনি বলেন, ভারতের হেজেমনিকত্বের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় এ অঞ্চলের দেশগুলো তাদের স্বাধীন নীতি ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

শনিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে রোজ একাডেমির আয়োজন করা ‘বাংলায় মুসলমানদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব মন্তব্য করেন। ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ইন্দিরা গান্ধীর আমলে বলা হয়েছিল, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, কিন্তু ১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ভারত সেই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে কেবল বাংলাদেশ ও ভুটানের ওপর ভারতের কিছুটা প্রভাব রয়েছে। পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ কিংবা আফগানিস্তান কোনো দেশই ভারতের ইচ্ছামতো নীতি মেনে চলেনি। পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়ায় ভারত তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। নেপাল, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হলেও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে ভারত ব্যর্থ হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় সামরিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে ভারত লঙ্কান যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। মালদ্বীপ থেকেও স্থানীয়রা ভারতীয় প্রভাবের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।

ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার ভারতের প্রভাবকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বীকার করছে। একইভাবে ভুটানের ওপর ভারতের পূর্ণ প্রভাব বিদ্যমান। এই দুই দেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার কোনো রাষ্ট্র ভারতের হেজেমনিকে স্বীকার করেনি।

আলোচনায় তিনি বিশ্ব রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন—লিডার, হেজেমন, ডমিনেটর, ডিচ পাওয়ার এবং পটেনশিয়াল পাওয়ার। লিডার রাষ্ট্র হলো যে রাষ্ট্র অন্যদের উন্নয়নে সহায়তা করে, যেমন নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ আফ্রিকা। হেজেমন রাষ্ট্র তার অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজের অধীনে রাখতে চায়, যেমন ইন্দিরা গান্ধীর ভারতের উদাহরণ। ডমিনেটর রাষ্ট্র যে কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলে তাকে দমন করে, যেমন ইসরাইল। ডিচ অ্যাটিটিউডের উদাহরণ হিসেবে তিনি ইন্দোনেশিয়া উল্লেখ করেন, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও বৈশ্বিক বিষয়ে সক্রিয় হস্তক্ষেপ করে না। পটেনশিয়াল পাওয়ার রাষ্ট্রের উদাহরণ হিসেবে তিনি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে উল্লেখ করেছেন, যারা অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠলে ভবিষ্যতে প্রভাবশালী শক্তি হতে পারে।

ড. মাহমুদুর রহমান ইতিহাসের আলোকে বলেন, রোমান সাম্রাজ্য পৃথিবীর প্রথম বড় সাম্রাজ্য ছিল। এরপর ব্রিটিশরা ১৯শ শতকে সবচেয়ে বড় কলোনিয়াল এম্পায়ার গড়ে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই উপনিবেশবাদ ভেঙে পড়ে, কিন্তু অর্থনৈতিক শোষণের মাধ্যমে নতুন ‘নিও-কলোনিয়ালিজম’ সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা আমেরিকান সাম্রাজ্যের ছায়াতলে বাস করছি। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দেশ দখল না করলেও তার অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে আমরা ইউনিপোলার বিশ্বের অধিবাসী, যা মার্কিন নেতৃত্বে পরিচালিত। তবে চীনের উত্থানের ফলে আগামী ৫০ বছরে নতুন মাল্টিপোলার বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের হেজেমনিক চেষ্টা সীমিত পরিসরে সফল হয়েছে। তিনি বলেন, প্রকৃত নেতা অন্যদের উন্নয়নে অংশীদার করে, প্রভুত্ব কায়েম করে না।

আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. যুবায়ের মুহাম্মদ এহসানুল হক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনিসুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন মাহমুদুল হাসান হাসেমী।

ড. মাহমুদুর রহমানের বক্তব্যে উঠে আসে যে, ভারতের প্রচেষ্টা শুধুমাত্র প্রভাব বিস্তার এবং প্রভুত্ব কায়েমের দিকে কেন্দ্রীভূত ছিল, কিন্তু বাস্তবতার পরীক্ষায় ভারত তার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে স্বাধীন নীতি ও নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, ভারতের প্রভাব কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা এই অঞ্চলে শক্তি ও কৌশলের ব্যর্থতার প্রতিফলন।

বাংলাদেশে এই প্রভাব এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটও আলোচনায় উল্লেখ করা হয়। ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ভারতের সমঝোতা ও সম্পর্ক বজায় থাকলেও দেশের স্বতন্ত্র নীতি ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষিত। অন্যদিকে পাকিস্তান ও নেপালসহ অন্যান্য দেশের প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ ভারতের হেজেমনিক লক্ষ্যকে ব্যর্থ করেছে।

অন্যদিকে, ইতিহাস ও বর্তমান রাজনৈতিক কৌশল বিশ্লেষণ করে ড. মাহমুদুর রহমান উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে হেজেমনিক রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জগুলো অনেক। এর জন্য অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক শক্তি এবং কূটনৈতিক নীতি সমন্বয় প্রয়োজন। ভারত এই সমস্ত ক্ষেত্রে চেষ্টা করেও দক্ষিণ এশিয়ায় পূর্ণ প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

সর্বশেষে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো স্বতন্ত্রভাবে নিজেদের নীতি, শাসন এবং উন্নয়ন কৌশল তৈরি করে চলেছে। ভারতের চেষ্টা থাকলেও প্রকৃত নেতার বৈশিষ্ট্য হলো অন্যকে শক্তিশালী করে একসাথে উন্নয়নের পথ গড়ে তোলা, যা ভারত ব্যর্থ হয়েছে করতে। ড. মাহমুদুর রহমানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের সীমিত প্রভাবই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এবং দেশগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত