ভারতীয় আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদমুক্ত সংসদ গঠনের আহ্বান হাসনাত আব্দুল্লাহর

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩২ বার
ভারতীয় আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদমুক্ত সংসদ গঠনের আহ্বান হাসনাত আব্দুল্লাহর

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ধারার একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দিয়েছে—তারা চায় একটি “প্রতিনিধিত্বমূলক, ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী ও ফ্যাসিবাদমুক্ত” সংসদ। দলটির দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক সংসদের অপেক্ষায়, যা সত্যিকার অর্থে হবে “বাংলাদেশপন্থি” ও জনগণের স্বার্থরক্ষার প্রতীক।

রোববার (৯ নভেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে কুমিল্লা নগরীর একটি রেস্টুরেন্টের হলরুমে অনুষ্ঠিত হয় এনসিপির কুমিল্লা মহানগর, কুমিল্লা উত্তর ও দক্ষিণ জেলার সমন্বয় সভা। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “আমরা এমন একটি সংসদ চাই, যেখানে থাকবে জনগণের কণ্ঠস্বর, যেখানে সিদ্ধান্ত আসবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ থেকে, বাইরের কোনো শক্তির ইঙ্গিত থেকে নয়।”

তিনি বলেন, “আমরা ভারতীয় আধিপত্যমুক্ত রাজনীতি চাই। আমাদের জনগণ চায় স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, আত্মমর্যাদা ও স্বাভিমানের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা। বাংলাদেশ যে চেতনায় জন্ম নিয়েছে, সে চেতনার পুনরুদ্ধারই এখন সময়ের দাবি।”

হাসনাত আরও বলেন, “বিএনপি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ থেকে সরে গেছে। ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পুরোপুরি বদলে গেছে। যারা সেই পরিবেশে নিজেদের অসহায় ও অস্বস্তিতে মনে করছেন, তাদের জন্য এনসিপি একটি নতুন আশ্রয়। আমরা আপনাদের স্বাগত জানাই।”

তিনি জানান, এনসিপি কুমিল্লার ১১টি আসনে “সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক” প্রার্থী দেবে। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম ধাপের প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। “এই ঘোষণার মাধ্যমেই আমরা এনসিপির নির্বাচনি যাত্রা শুরু করব,” বলেন তিনি।

সভায় উপস্থিত নেতাকর্মীরা হাসনাতের বক্তব্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তারা জানান, এনসিপি বর্তমানে যে অবস্থান নিয়েছে, তা দেশের তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কারণ, জনগণ এখন এমন একটি রাজনীতি চায় যেখানে থাকবে স্বাধীনচেতা নেতৃত্ব, নৈতিক সাহস এবং বিদেশি প্রভাব থেকে মুক্ত একটি জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ব্যারিস্টার মাজহারুল ইসলাম। বক্তব্য রাখেন এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আতাউল্লাহ, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, জয়নাল আবেদীন শিশির, কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক নাভিদ নওরোজ শাহ, কেন্দ্রীয় সদস্য হাফসা জাহান ও সালাউদ্দিন জামিল সৌরভ। কুমিল্লা মহানগর এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী মো. সিরাজুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।

সভায় নেতারা বলেন, দেশের রাজনীতি আজ এক সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা হলো এমন একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো, যা জাতীয় মর্যাদা রক্ষা করবে, বিদেশি প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করবে না এবং ফ্যাসিবাদী রাজনীতির জায়গা নেবে গণমানুষের অধিকার।

হাসনাত আব্দুল্লাহ তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, “আমরা এমন একটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে রাজনীতি হবে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে, লুটপাট ও ক্ষমতার দৌড়ে নয়। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি সংসদ গঠন, যা জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে।”

তিনি বলেন, “আজকের তরুণ প্রজন্ম অন্যায়, দুর্নীতি ও অন্যদেশের প্রভাবমুক্ত একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়। তারা চায় পরিবর্তন—একটি এমন পরিবর্তন, যা বাস্তব, সংগঠিত এবং জনগণকেন্দ্রিক। এনসিপি সেই পরিবর্তনের প্ল্যাটফর্ম হতে চায়।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিপির এই বক্তব্য বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, “ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী” বক্তব্যটি বাংলাদেশের আঞ্চলিক রাজনীতিতে সবসময়ই সংবেদনশীল একটি ইস্যু। দেশের জনগণের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে মনে করে, ভারতের প্রভাব বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত ভূমিকা রাখছে। এনসিপি সেই ইস্যুটিকেই রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, হাসনাতের বক্তব্যের মধ্যে “ফ্যাসিবাদমুক্ত রাজনীতি”র কথা উল্লেখ করে দলটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি তাদের অঙ্গীকারও স্পষ্ট করেছে। তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, কোনো সরকারের বিরুদ্ধেই যদি জনগণের কণ্ঠস্বর বন্ধ করা হয়, সেটি ফ্যাসিবাদের রূপ। আমরা এমন রাজনীতি চাই না। আমাদের রাজনীতি হবে জনগণের অংশগ্রহণে, সমালোচনার স্বাধীনতায় এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চায়।”

সভায় উপস্থিত তরুণ নেতারা জানান, তারা এনসিপির ঘোষণাকে একটি “নতুন সূচনা” হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দেশের রাজনীতি এখন এমন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, যেখানে পুরোনো দলগুলোর ওপর জনগণের আস্থা অনেকটাই নষ্ট হয়েছে। মানুষ এখন নতুন নেতৃত্ব ও নতুন নীতির দিকে তাকিয়ে আছে।

এনসিপির সংগঠক আতাউল্লাহ বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, রাজনীতি মানে সেবা, আর সংসদ মানে জনগণের কণ্ঠস্বর। যে সংসদে বিদেশি স্বার্থের ছায়া থাকবে, সেখানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব সম্ভব নয়। তাই আমাদের সংগ্রাম জনগণের মর্যাদার সংগ্রাম।”

সমাবেশ শেষে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে একান্ত আলাপে হাসনাত জানান, কুমিল্লা অঞ্চলকে এনসিপি একটি “কৌশলগত কেন্দ্র” হিসেবে দেখছে। এখান থেকেই দলটি তার নির্বাচনি কার্যক্রম শুরু করবে। তিনি বলেন, “আমরা চাই, কুমিল্লা হোক পরিবর্তনের সূতিকাগার। এখান থেকে নতুন রাজনীতি, নতুন ভাবনা ও নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটুক।”

এনসিপির সমন্বয় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হাসনাত আরও বলেন, “আমরা কোনো দল বা মতের বিরোধিতা করতে আসিনি। আমরা এসেছি একটি ইতিবাচক বিকল্প দিতে। জনগণ এখন জেগে উঠেছে—তারা চায় স্বাধীনচেতা নেতৃত্ব, যারা দেশের জন্য ভাববে, নিজের বা কোনো শক্তির স্বার্থে নয়।”

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এনসিপি যদি তাদের এই ঘোষণাগুলো বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তাহলে দেশের রাজনীতিতে এটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কাঠামো, স্পষ্ট নীতি ও বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব।

সর্বোপরি, এনসিপির এই সভা এবং হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—দেশের জনগণ এখন এমন রাজনীতি চায়, যা হবে বাংলাদেশকেন্দ্রিক, স্বাধীন ও মানবিক মূল্যবোধে প্রতিষ্ঠিত। এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই হয়তো এনসিপি তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার প্রথম দৃঢ় পদক্ষেপ রাখল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত