প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের পরিবর্তনের নতুন রাজনীতি গড়ে তোলার প্রত্যয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “আমরা আজ কলি হয়ে আছি, ইনশাল্লাহ, যদি আপনারা আমাদের সঙ্গে থাকেন, আমরা একদিন ফুটবই।” তাঁর এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতি আহ্বান নয়, বরং একটি নবজাগরণের প্রতীকী ঘোষণা, যা সাধারণ মানুষের আশা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিশে গেছে।
রোববার (৯ নভেম্বর) রাতে এনসিপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি দেশের নাগরিকদের উদ্দেশে দীর্ঘ বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি দলীয় প্রতীক, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে কথা বলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, আবেগ, আর এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা অনেক লড়াই করে একটি সুন্দর প্রতীক জয় করে নিয়েছি—শাপলাকলি। এটি শুধু একটি প্রতীক নয়, এটি আমাদের নদীময় সভ্যতার প্রতিচ্ছবি। শাপলাকলি শুভ্রতার, সৌন্দর্যের এবং নির্মলতার প্রতীক। আমরা চাই রাজনীতি হোক এই শুভ্রতার মতো, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন।”
তিনি বলেন, “আপনি হয়তো কখনো ভাবেননি রাজনীতিতে আসবেন। হয়তো রাজনীতি আপনার কাছে ভয়ের, দূরের কিংবা নোংরা মনে হয়েছে। আপনি হয়তো মনে করেছেন রাজনীতি কেবল ধনীদের, প্রভাবশালীদের বিষয়। কিন্তু রাজনীতি আসলে আপনার জীবনধারার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত—আপনি কোথায় কাজ করবেন, আপনার সন্তান কোন শিক্ষা পাবে, আপনি কোন চিকিৎসা পাবেন, রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে—সবকিছু রাজনীতির সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়। তাই রাজনীতি থেকে দূরে থাকা মানে নিজের ভবিষ্যৎ থেকে দূরে থাকা।”
এই কথাগুলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নাহিদ ইসলামের রাজনীতি সাধারণ মানুষের রাজনীতি—যেখানে অংশগ্রহণ, দায়িত্ববোধ ও জাতীয় চেতনা একসঙ্গে মিশে আছে।
তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষই সামনের সারিতে ছিল। রাজনীতিবিদরা তখন মাঠে নামেননি, লড়াইটা করেছে জনগণ। তাই আমরা বলছি, এবার জনগণকেই রাজনীতিকে নিজের হাতে নিতে হবে। রাজনীতি টাকাওয়ালা, দখলদার বা লুটেরাদের হাতে থাকতে পারে না। রাজনীতি হতে হবে সাধারণ মানুষের, যারা সত্যিকার অর্থে দেশ বদলাতে চায়।”
নাহিদ ইসলামের এই বার্তাটি কেবল একটি দলীয় বক্তব্য নয়, বরং জনগণকে সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বানও বটে। তিনি বলেন, “আপনার যদি সত্যিকারের পরিবর্তনের অঙ্গীকার থাকে, যদি আপনি দেশকে নতুনভাবে দেখতে চান, তাহলে আপনি আসুন—রাজনীতিতে আসুন, অংশ নিন, রাজনীতিকে নিজের করে নিন। আমরা চাই, রাজনীতি হোক মানুষের, দেশের, জাতির।”
তিনি আরও বলেন, “জনগণের ভোট নিয়ে যারা সংসদ ভবনে আসেন, সেই সংসদ ভবন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সেখানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। সেই ভবন ব্যবহার করা হয়েছে সংবিধানকে বিকৃত করতে, রাষ্ট্রকে দলীয়করণ করতে। এই ভবনকে মুক্ত করতেই আমরা ৫ আগস্ট জনগণের সঙ্গে সংসদ ভবনে প্রবেশ করেছিলাম। সেটি কোনো ক্ষমতার প্রদর্শনী ছিল না, বরং জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধারের এক প্রতীকী অভিযাত্রা ছিল।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের সেই ঐতিহাসিক ঘটনার পর এনসিপি অবিরামভাবে সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। “আমরা দেশের প্রতিটি সেক্টরের সমস্যা চিহ্নিত করেছি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশাসন, দুর্নীতি—সব ক্ষেত্রে কীভাবে পরিবর্তন আনা যায়, সেই বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। আমরা চাই, এই সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এমন একটি সরকার গঠিত হোক, যা সত্যিকার অর্থে সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়ন করবে।”
তিনি মনে করেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের সূচনা করবে। “এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার নয়, এটি হবে দিক পরিবর্তনের নির্বাচন। আমরা চাই এমন একটি সংসদ, যা দেশকে পুনর্গঠনের পথ দেখাবে, যেখানে জনগণই হবে পরিবর্তনের চালিকাশক্তি।”
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে যে আশাবাদ ও মানবিক আবেগ ফুটে উঠেছে, তা অনেক তরুণের মন ছুঁয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর দেখা গেছে, হাজারো তরুণ-তরুণী তাঁর এই আহ্বানে সমর্থন জানাচ্ছেন। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, “আমরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকব না, এবার আমরাই পরিবর্তনের অংশ হব।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা বহন করে। যেখানে ক্ষমতার রাজনীতির পরিবর্তে তিনি তুলে ধরেছেন নৈতিক ও মানবিক রাজনীতির ধারণা। তাঁর ভাষায়, “রাজনীতি মানে আর দখল নয়, মানে অংশগ্রহণ। রাজনীতি মানে কেবল দলীয় স্বার্থ নয়, মানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ।”
একজন বিশ্লেষক বলেন, “নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে যে রূপক এসেছে—‘আমরা আজ কলি হয়ে আছি, একদিন ফুটবই’—এটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বোঝায় যে এনসিপি এখনো একটি নবীন সংগঠন, কিন্তু তারা আত্মবিশ্বাসী যে একদিন তারা জনগণের ভালোবাসায় বিকশিত হবে।”
নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বারবার আহ্বান জানান, সবাইকে রাজনীতিতে অংশ নিতে, সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে। তিনি বলেন, “রাজনীতি কোনো ভয়ের বিষয় নয়, এটি আপনার নিজের কণ্ঠের প্রতিফলন। আপনি যদি রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে অন্য কেউ আপনার জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে। আমরা চাই সেই সময়ের অবসান ঘটাতে।”
এনসিপি আহ্বায়ক আরও বলেন, “৫ আগস্টের পর থেকে আমরা যে সংস্কার আন্দোলন শুরু করেছি, সেটি কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক এক জাগরণ। আমরা চাই রাজনীতি হবে এমন, যেখানে একজন সাধারণ মানুষও নিজের কণ্ঠ তুলে ধরতে পারবেন, যেখানে কোনো ভয় থাকবে না, কোনো প্রভাব থাকবে না।”
তিনি বলেন, “আমরা যে ঐকমত্য কমিশন করেছি, সেখানে দেশের সব অংশের মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। এই কমিশনের মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের নীলনকশা তৈরি হচ্ছে। তবে তার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে আসন্ন সংসদ নির্বাচনের ওপর। যদি আমরা সত্যিকারের জনগণের প্রতিনিধিদের সংসদে পাঠাতে পারি, তবে আগামী সংসদ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সংসদ।”
ভিডিও বার্তার শেষভাগে নাহিদ ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশ এখন এক নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়। আমরা আজ কলি হয়ে আছি, কিন্তু আমরা ফুটবই—এটাই আমাদের অঙ্গীকার, এটাই আমাদের বিশ্বাস। আপনারা যদি পাশে থাকেন, তবে সেই ফুল ফুটবেই, যেটি এই দেশের স্বপ্নকে বাস্তব করবে।”
নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্যে যেমন আশা আছে, তেমনি আছে প্রতিরোধের সুর। তিনি রাজনীতিকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে আনার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা অনেকের কাছে এখন এক নবজাগরণের ডাক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বার্তা হয়তো নতুন এক দিগন্তের সূচনা করবে—যেখানে রাজনীতি হবে মানুষের, মানুষের জীবনের, এবং মানুষের ভালোবাসার প্রতিফলন।










