প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সীমান্ত উপকূলে অবৈধভাবে অভিবাসীবাহী একটি নৌকা ডুবে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। মালয়েশিয়ার সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, নৌকাডুবি থেকে মোট ১৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে দুইজন বাংলাদেশি রয়েছেন। তবে এই দুর্ঘটনায় এখনও শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ জন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি দুই সপ্তাহ আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে একটি বড় নৌকায় যাত্রা শুরু করেন। পরে নিরাপত্তার স্বার্থে তারা কয়েকটি ছোট নৌকায় ভাগ হয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। মালয়েশিয়ার কোস্টগার্ড জানায়, দুর্ঘটনাকবলিত নৌকাটি দেশটির জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপ লাংকাউইয়ের কাছে সমুদ্রে ডুবে যায়।
রোববার (৯ নভেম্বর) উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। মালয়েশিয়ার সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযান এখন ১৭০ থেকে ২৫৬ বর্গ নটিক্যাল মাইল এলাকায় সম্প্রসারিত করা হয়েছে এবং অভিযান অন্তত সাত দিন চলবে বলে আশা করা হচ্ছে। উদ্ধারকাজে মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড এবং স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী একত্রে কাজ করছে। রোববার পানিতে যে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়েছে, তা একজন রোহিঙ্গা নারীর বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা বারনামা।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ডুবে যাওয়া নৌকাটিতে প্রায় ৭০ জন যাত্রী ছিলেন। তবে অন্যান্য নৌকাগুলোর অবস্থান এখনও ‘অস্পষ্ট’। উদ্ধারকাজ চলাকালে আবহাওয়া ও সমুদ্রের দাপট যাত্রীদের সঠিক অবস্থান নির্ণয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের অস্থির পরিবেশ, সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরিকল্পিত নৌযাত্রা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনায় রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি পরিবারগুলো উদ্বেগ ও শোকের মধ্যে রয়েছে। যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের পরিবার সদস্যরা ভয় ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। পরিবারের একজন জানান, “আমরা আমাদের স্বজনদের খুঁজছি। প্রত্যেক মুহূর্তে ভয় পাই, কে কি অবস্থায় আছে। নদী আর সমুদ্র আমাদের কাছে এক অসম যুদ্ধক্ষেত্রের মতো।”
উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়ে আসে। ২০১৭ সালের আগস্টে সেনাবাহিনী অভিযানের পর লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। এই অভিবাসীরা পরে সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করেন, যেখানে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র ও নদীর পথে যাত্রা শুরু করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের নৌকাডুবি মানবপাচার চক্র এবং অভিবাসী সংকটের প্রতিচ্ছবি। সীমান্তবর্তী এলাকায় যথাযথ নজরদারি না থাকায় অপরিকল্পিত নৌযাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন, তবে সীমান্তরেখার দৈর্ঘ্য ও গভীর সমুদ্র অঞ্চলগুলোর কারণে এটি যথেষ্ট কঠিন কাজ।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ধরনের দুর্ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও নিখোঁজদের উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছেন, “রোহিঙ্গা ও অন্যান্য অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাদের মানবিক অধিকার রক্ষা করতে তৎপর হতে হবে। সীমান্তরক্ষীদের সহায়তায় উদ্ধার কার্যক্রম আরও কার্যকর করা সম্ভব।”
দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উদ্ধারকাজে সহযোগিতা এবং নিখোঁজ দুই বাংলাদেশির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তারা বলেন, “আমাদের দু’জন প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।”
উদ্বেগের বিষয় হলো, যে নৌকাটি ডুবে গেছে তা বড় নৌকায় শুরু হলেও ছোট নৌকায় ভাগ হওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া কোস্টগার্ড ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, সমুদ্রের উচ্চ ঢেউ এবং সীমিত ভিজিবিলিটি কাজে জটিলতা সৃষ্টি করছে। সুতরাং নিখোঁজদের উদ্ধারে সময় লাগতে পারে এবং আরও প্রাণহানি হতে পারে।
এই নৌকাডুবি পুনরায় মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, রোহিঙ্গা এবং সীমান্তবর্তী অভিবাসীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংস্থা ও সরকারগুলোর একযোগে পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত এমন বিপর্যয় এ ধরনের নৌকাযাত্রায় অব্যাহত থাকবে।
এভাবে থাই-মালয়েশিয়া সীমান্তে নৌকাডুবিতে সাতজন নিহত ও দুই বাংলাদেশি উদ্ধার হওয়া ঘটনা শুধু একটি মানবিক বিপর্যয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, অভিবাসন নীতি ও নিরাপদ যাত্রার প্রয়োজনীয়তার তীব্র সতর্কবার্তা। উদ্ধার অভিযান চলমান এবং নিখোঁজদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন প্রধান অগ্রাধিকার।