প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে উন্নীত করতে বিদেশি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। সোমবার (১০ নভেম্বর) সকালে পতেঙ্গা এলাকার লালদিয়া চর কন্টেইনার ইয়ার্ড উদ্বোধনকালে তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বন্দরের কার্যক্রমকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের করার জন্য বিদেশি ব্যবস্থাপনা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।”
ড. এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, লালদিয়া চর কন্টেইনার টার্মিনাল প্রকল্পটি মূলত ৩২ একর জায়গার ওপর নির্মিত হচ্ছে। এর মধ্যে বর্তমানে ১৪ একর জায়গা কন্টেইনার ইয়ার্ড হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এই নতুন ব্যবস্থা চালু হলে বন্দরের কনটেইনার ধারণ ক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার একক বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে এক বড় সুবিধা হিসেবে কাজ করবে। তিনি আরও বলেন, “কেবল অবকাঠামো নয়, বন্দরের সার্বিক পরিচালনা, যাত্রী ও মালামাল হ্যান্ডলিং এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি জরুরি।”
তিনি বলেন, বন্দরের ট্যারিফ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে পূর্ণ আলোচনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে সকলের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ধরনের স্বচ্ছতা বন্দর ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি করবে।
ড. এম সাখাওয়াত হোসেন সকালে আরও বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য ও লজিস্টিক নেটওয়ার্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই এর আন্তর্জাতিক মানের উন্নয়ন একান্ত জরুরি।” তিনি জোর দেন, বিদেশি ব্যবস্থাপনা ও অভিজ্ঞতা গ্রহণ করলে বন্দরের দক্ষতা, নিরাপত্তা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং মালামাল হ্যান্ডলিং সব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে।
লালদিয়া চর কন্টেইনার টার্মিনালের উদ্বোধনের পর নৌপরিবহন উপদেষ্টা বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে বে টার্মিনাল এলাকায় উপস্থিত হয়ে পরিবহন টার্মিনালও উদ্বোধন করেন। এই টার্মিনাল উদ্বোধনের মাধ্যমে বন্দরের মালবাহী যানবাহন ও কনটেইনার পরিবহণ আরও সুসংহত হবে এবং বন্দরের লজিস্টিক কার্যক্রম আরও দ্রুত ও কার্যকরী হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা দেশের অর্থনীতিকে একটি নতুন মাত্রা দেবে। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে আমদানি-রফতানি খরচ কমবে, বাণিজ্যিক জটিলতা হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শৃঙ্খলার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও সুদৃঢ় হবে।
এছাড়া, বন্দরের আন্তর্জাতিক মানের উন্নয়ন শুধু বাণিজ্যিক সুবিধা নয়, স্থানীয় অর্থনীতিকেও বড় প্রভাব ফেলবে। স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে, পরিশ্রমিকদের জন্য আরও মানসম্মত পরিবেশ তৈরি হবে এবং দেশের সামুদ্রিক অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি ব্যবস্থাপনা ও অভিজ্ঞ পরামর্শ নেওয়া হলে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কার্যক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, “বন্দর শুধু মালামাল স্থানান্তরের জায়গা নয়, এটি দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক মর্যাদার প্রতিফলন। তাই আমাদের উচিত এ ধরনের প্রকল্পে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করা।” তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই ধরনের উদ্যোগ দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দেবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করবে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সামলাচ্ছে। বর্তমানে বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল ও অবকাঠামো আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। লালদিয়া চর কনটেইনার টার্মিনাল ও বে টার্মিনালের উদ্বোধনের ফলে বন্দরের ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার নতুন যুগের সূচনা হবে।
নিরীক্ষকরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক মানের বন্দর পরিচালনা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নয়, বরং প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, শ্রমশক্তি ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং পরিবহন নেটওয়ার্কের সুসংগত সমন্বয়ও প্রয়োজন। বিদেশি অভিজ্ঞতা গ্রহণ করলে এই সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই উন্নয়ন কর্মসূচি দেশের বাণিজ্যিক দিককে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দেবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার লজিস্টিক মানচিত্রে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেবে।