প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গত বছরের জুলাইয়ে ছাত্র গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সময়ে এমন এক মারাত্মক নির্দেশ ছিল, যা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জানা গেছে, ওই সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বলেন, ‘আজ রাতেই কারফিউ দিয়ে বিক্ষোভকারীদের শেষ করে দিন।’ এই নির্দেশের বিষয়টি তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে অবহিত করা হয়েছিল।
সেই সময়কার পরিকল্পনার তথ্য সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে। আমার দেশকে পাওয়া অডিওর ভিত্তিতে দেখা গেছে, সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হকের মধ্যে টেলিফোন কথোপকথনে বিষয়টি স্পষ্ট। কথোপকথনে আনিসুল হক সালমানকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছিলো বিক্ষোভ দমন করার জন্য ‘কারফিউ দিয়ে আজ রাতেই শেষ করার’। সালমানও এ বিষয়ে নিশ্চিত করেন যে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালও এটি জানিয়েছিলেন।
জানাগেছে, শুধু এই নির্দেশ নয়, জুলাই আন্দোলন দমন করতে শেখ হাসিনার পরিকল্পনা ছিল আরও বিস্তৃত। তৎকালীন সহকারী সামরিক সচিব কর্নেল রাজীবকে কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সেনা মোতায়েন করে গুলি চালিয়ে বিক্ষোভ দমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, সালমানের টাকায় আওয়ামী লীগ ক্যাডার দিয়ে আন্দোলনকারীদের হত্যা এবং গণগ্রেপ্তারের ব্যবস্থা করার কথাও ছিল। সেই সময়ে ৬ জন আন্দোলনকারীর গ্রেপ্তার ও ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার ঘটনাও একই অডিওতে উল্লেখ রয়েছে।
অডিওর কথোপকথনে দেখা যায়, আনিসুল হক এবং সালমান রহমান একে অপরকে বিষয়টি নিশ্চিত করছেন। কথোপকথনের একটি অংশে আনিসুল হক বলেন, ‘এখানে দুই বিকল্প রয়েছে—একটা হলো আজ রাতেই কারফিউ দিয়ে আন্দোলনকারীদের শেষ করা।’ সালমানও উত্তর দেন, ‘হু-উ-ম, বলেন।’ এরপর আনিসুল হক আরও বলেন, ‘এই বিষয়ে টেলিফোনে আর বলা উচিত নয়। গো ফর দ্য রিয়েল হার্ডলাইন।’ সেই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালকে বিষয়টি জানাতে হবে, এবং সেনা অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলন দমনে ব্যর্থ হলে শেখ হাসিনার সরকার ১৯ জুলাই রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি করে সেনা মোতায়েন করেছিল। এই কারফিউ চলছিল ৫ আগস্ট পর্যন্ত, যখন প্রধানমন্ত্রী ভারতে চলে যান। পরে সেনাপ্রধান দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেন, পরিস্থিতি শান্ত হলে কারফিউ প্রত্যাহার করা হবে। বাস্তবে, শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পরই কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়।
অডিওতে দেখা যায়, আনিসুল হক এবং সালমান রহমানের মধ্যে কথোপকথন অত্যন্ত গোপনভাবে চালানো হয়। তাঁরা দুইজনই বুঝতে পারছিলেন, বিষয়টি সংবেদনশীল এবং সরাসরি ফোনে বলা ঠিক নয়। কথোপকথনে ব্যবহৃত শব্দচয়ন এবং নির্দেশনার গুরুত্ব বিচার করলে বোঝা যায়, সরকারিভাবে আন্দোলন দমন করতে সেনা মোতায়েন এবং কারফিউ প্রয়োগের পরিকল্পনা ছিল।
এই তথ্য ফাঁস হওয়া নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্বাধীন বিচারপ্রক্রিয়া ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে এই নির্দেশ এবং তার বাস্তবায়নের ঘটনা সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। অডিওতে উল্লেখিত সব তথ্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য হলেও এ বিষয়ে সরকার, রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া এখনও মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়নি।
জুলাই আন্দোলনের সময়ে জাতিসংঘের তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় প্রায় ১৪০০ জন নিহত হয়েছিল। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে কারফিউয়ের মাধ্যমে গণহত্যার পরিকল্পনার অডিও ফাঁস হওয়ায় দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা নতুনভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
সংবাদটি নতুনভাবে পুনর্বিন্যস্ত করে দেখায়, টেলিফোনে চলা কথোপকথনগুলোতে শুধু হত্যার পরিকল্পনার নির্দেশ নয়, সেনা মোতায়েন, আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার ও কারফিউ প্রয়োগের বিস্তারিত ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ কারণে এটি নিছক রাজনৈতিক বিবাদ নয়, বরং একটি সময়ের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট চিহ্নিত করছে।