প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ অঙ্গন সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ ও তার আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে জাতীয় ঈদগাহ মাঠে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। ১৩ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নাশকতা ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এড়াতে এই নির্দেশনা জারি করা হয়।
রোববার (৯ নভেম্বর) সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন শাখা থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ শুধু বিচারপতি, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল নয়; বরং এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, যেখানে বহু আলোচিত মামলা, গুরুত্বপূর্ণ রায় ও কয়েক লক্ষ মামলার নথি সংরক্ষিত রয়েছে। এই প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তা বিচারিক কার্যক্রমের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় ঈদগাহ মাঠ ও প্রধান বিচারপতির ফোয়ারা এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের চলাফেরা ও সমাবেশের চেষ্টা নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন মনে করছে, নিরাপত্তার স্বার্থে এই মুহূর্তে বহিরাগতদের প্রবেশ সীমিত রাখা প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা সাময়িক হলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগে কঠোর নজরদারি থাকবে। আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ, নিরাপত্তা সংস্থা এবং প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, সুপ্রিম কোর্ট ও বিশেষ কোর্ট নিরাপত্তা বিভাগ, শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং প্রবেশপথের নিরাপত্তাকর্মীদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অতীতে বড় রায় ঘোষণার আগে আদালত প্রাঙ্গণে বা তার আশপাশে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমাবেশ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির ঘটনা ঘটেছিল। তাই এবার কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি না রাখতেই আগাম সতর্ক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আইনজীবীদের একটি অংশ জানিয়েছেন, জাতীয় ঈদগাহ মাঠে বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধের পদক্ষেপটি যৌক্তিক, কারণ ঈদগাহ মাঠটি সুপ্রিম কোর্টের সীমানা ঘেঁষে অবস্থিত এবং আদালতের নিরাপত্তায় যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এই এলাকাটি দিয়ে প্রতিদিন অনেক মানুষ যাতায়াত করে, যার মধ্যে অনেকে বিচার প্রাঙ্গণের সঙ্গে সম্পর্কহীন। এই সুযোগে কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে এলাকায় প্রবেশ করলে তা বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট কেবল একটি আদালত নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের প্রতীক। এখানে নিরাপত্তা ভঙ্গ হলে সেটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদার জন্যও হুমকি। তাই এমন সময়, যখন একটি ঐতিহাসিক মামলার রায় ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে, তখন কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকাটাই যৌক্তিক।”
এদিকে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রায় ঘোষণার দিন সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হবে। বাড়ানো হবে পুলিশের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হবে অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা এবং স্থাপন করা হবে বিশেষ চেকপোস্ট। সাংবাদিক, আইনজীবী, মামলার পক্ষ এবং অনুমোদিত ব্যক্তিদের প্রবেশের জন্য আলাদা পাস ব্যবস্থা থাকবে।
সরকারি এক কর্মকর্তা জানান, “জাতীয় ঈদগাহ মাঠে প্রবেশ বন্ধ রাখার উদ্দেশ্য হলো, যাতে কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। রায় ঘোষণার দিনকে ঘিরে দেশজুড়ে দৃষ্টি থাকবে সুপ্রিম কোর্টে। তাই প্রশাসন চায় সবকিছু নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হোক।”
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে বড় রাজনৈতিক বা বিচারিক রায় ঘোষণার সময় রাজধানীতে নাশকতা বা সহিংসতা ঘটানোর চেষ্টা দেখা গেছে। তাই এবার প্রশাসন কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। এই পদক্ষেপকে তাঁরা “প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থা” হিসেবে দেখছেন।
প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রায়ের দিন নির্ধারিত হবে ১৩ নভেম্বর। দেশের ইতিহাসে এই রায়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হওয়ায় আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রায় ঘোষণার আগে থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ, কোর্ট এলাকা এবং এর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হবে। প্রয়োজনে রায়ের দিন সকালে যান চলাচলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আনা হতে পারে।
সবমিলিয়ে, দেশের বিচার ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু সুপ্রিম কোর্ট এখন কঠোর নিরাপত্তার বেষ্টনীতে। প্রশাসনের লক্ষ্য—ন্যায়বিচারের প্রাঙ্গণে যেন কোনো বিশৃঙ্খলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, যাতে আদালত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারে।