সরঞ্জাম সংকটে চিকিৎসা ব্যাহত, গাজার আহত ফিলিস্তিনির দুঃখ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
সরঞ্জাম সংকটে চিকিৎসা ব্যাহত, গাজার আহত ফিলিস্তিনির দুঃখ

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজা, যা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে অবরুদ্ধ ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত, সেখানে চিকিৎসা সেবা এখন এক ভয়ংকর সংকটে পড়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও ত্রাণসামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রবেশে ইসরাইলের বাধা অব্যাহত থাকায় হাসপাতালে রোগীদের সেবা অনেকাংশে ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে আহত ও অসুস্থ সাধারণ মানুষের ওপর। বিশেষ করে যারা যুদ্ধের সময় আহত হয়েছে বা ঘরবাড়ি ধ্বংসের ফলে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তাদের চিকিৎসা এখন ঝুঁকিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ।

খান ইউনুসের একটি হাসপাতালের বেডে বসে দিন গুনছেন বারা আবু জায়েদ নামে এক ফিলিস্তিনি নারী। তার চোখে ভরা ভয়, যা সুস্থ হওয়ার আশার চেয়ে বেশি। তিনি জানেন, তার পক্ষে এখন সুস্থ হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধের অভাবে তার চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। বারা আবু জায়েদকে ঘিরে হাসপাতালের পরিবেশটি দারুণ চাপগ্রস্ত। চিকিৎসকরা যত দ্রুত সম্ভব রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ঔষধের অভাবে সেই প্রচেষ্টা প্রায়শই ব্যর্থ হচ্ছে।

বারা আবু জায়েদ তিন সন্তানের জননী। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি তার নিজ বাড়ি থেকে পালিয়ে দক্ষিণ গাজার রাফা থেকে খান ইউনুসের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তার আশ্বাস যেখানে পাওয়া উচিত ছিল, সেখানে শুরু হয়েছিল ড্রোন হামলা। সেই ঘটনায় তার দুই সন্তান নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৩ বছর বয়সি মেয়ে ওবাইদা এবং নিজেও। নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেছেন।

বারার মতো হাজার হাজার নারী, শিশু ও বৃদ্ধ এখন গাজার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এসব হাসপাতালে রয়েছে সীমিত পরিমাণে অক্সিজেন সিলিন্ডার, ইনট্রাভেনাস ফ্লুইড, ব্যান্ডেজ, ব্যথানাশক এবং মৌলিক সার্জিক্যাল সরঞ্জাম। কিন্তু যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইল ত্রাণসামগ্রী ও ওষুধের প্রবেশে সীমাবদ্ধতা জারি রেখেছে। ফলে চিকিৎসকরা জরুরি অস্ত্রোপচার বা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সেবা দিতে পারছেন না।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাসপাতালে আসা আহত ও অসুস্থদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ঠিক মতো চিকিৎসা পাচ্ছে না। অনেকের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। শিশুদের মধ্যে, বিশেষ করে যাদের বয়স কম, তাদের জন্য পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের অভাব ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। গাজার এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

গাজার রাফা শহরের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, শীতের আগমনে বাস্তুচ্যুত ও আহত মানুষদের জন্য মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে। তাঁবু ও ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর কাছে শীত ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা জানিয়েছে, এখনই পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি গুরুতর মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। এই মুহূর্তে গাজার শরণার্থী শিবিরগুলোতে শিশুদের ঠান্ডা, ক্যান্সার ও শ্বাসকষ্টের মতো রোগের ঝুঁকি বেড়ে গেছে।

হাসপাতালে থাকা চিকিৎসক ও নার্সরা প্রতিদিন নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন, তবুও তাদের সামর্থ্য সীমিত। অনেক চিকিৎসক জানিয়েছেন, তারা রোগীদের অতি সাধারণ জিনিসপত্র যেমন ব্যান্ডেজ, ইনজেকশন, ব্যথানাশক ও সাধারণ ওষুধের অভাবে বাধ্য হচ্ছেন রোগীদের জীবন রক্ষার দায়িত্বে ঝুঁকি নিতে। রোগীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছে, যার কারণে ছোট ছোট আঘাতও গুরুতর সমস্যায় পরিণত হচ্ছে।

বারার মতো আহত ফিলিস্তিনিরা শুধু শারীরিক ক্ষতির মুখে নেই, তাদের মানসিক চাপও অত্যন্ত গুরুতর। পরিবার হারানো, নিরাপত্তাহীনতা এবং চিকিৎসা সংকট একত্রিত হয়ে তাদের মানসিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। বারার মতো অনেকেই জানিয়েছেন, তারা প্রতিদিন মৃত্যু এবং জীবনের মধ্যে লড়াই করছেন। শিশুদের চোখে দেখা ভয় ও অনিশ্চয়তা, বড়দের হাহাকার এবং নারীদের শারীরিক দুর্বলতা এক মিলিত ছবি তৈরি করেছে, যা গাজার মানবিক পরিস্থিতিকে তুলে ধরছে।

অন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো বলছে, গাজার চিকিৎসা সংকট সমাধানের জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তারা দাবি করছে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও ত্রাণসামগ্রীকে অবাধে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই সরঞ্জাম ও ঔষধ সরবরাহের অভাবে না শুধুমাত্র মানুষের জীবন হুমকির মধ্যে পড়ছে, বরং দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের পুষ্টি, শিক্ষা ও মানসিক বিকাশেও প্রভাব পড়বে।

বারার মতো মানুষদের জীবনে এখন একমাত্র আশার স্পর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও ত্রাণসংস্থা। তারা চেষ্টা করছে সীমিত সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ করতে। তবে এই প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় হাসপাতালগুলোও সাময়িকভাবে সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় তারা ক্রমশ চাপের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।

বারা আবু জায়েদের মতো আহত ফিলিস্তিনিরা এখন প্রতিদিনের যুদ্ধকে নিজের জীবন হিসেবে অভিহিত করছেন। হাসপাতালের বেডে বসে, তিনি তার মেয়ের পাশে বসে চিন্তা করছেন কীভাবে তারা জীবিত থাকবেন। তার চোখে নিরাশা, কষ্ট এবং ভয় প্রতিফলিত হয়। গাজার এই মানবিক বিপর্যয় শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, গোটা বিশ্বকে সতর্ক করার একটি বার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে—যুদ্ধবিরতি থাকলেও মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য এবং মৌলিক অধিকার নিরাপদে রক্ষা পায়নি।

গাজা এখন শুধুই ভূখণ্ড নয়; এটি মানবিক সংকটের প্রতীক। বারার মতো আহত ও অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়া এই সংকটের প্রকৃত ছবি প্রকাশ করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবিক সংস্থা ও দেশগুলোর প্রতি আহ্বান, দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার এবং গাজার মানুষের জন্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার, যেন তারা সুস্থ জীবনের জন্য আবার আশা করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com