চাটমোহরের কুমড়ো বড়ি পাড়ি দিচ্ছে দেশ-বিদেশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৫ বার

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ রবিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আবহমান গ্রামবাংলার রান্নাঘরের অবিচ্ছেদ্য অংশ কুমড়ো বড়ি—নাম শুনলেই বাঙালির জিভে পানি আসে। ডাল, চালকুমড়া ও মসলার মিশেলে তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী খাবার একসময় ছিল কেবল গ্রামীণ রান্নাঘরের স্বাদবর্ধক, এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপ থেকে আমেরিকার প্রবাসী বাঙালিদের ঘরোয়া রান্নাতেও। শীতের দিনে গরম ভাত আর মিঠা পানির মাছের ঝোলে কুমড়ো বড়ির স্বাদই আলাদা, আর সেই স্বাদই আজ চাটমোহরের অসংখ্য পরিবারের জীবনে এনে দিয়েছে নতুন আলো।

পাবনার চাটমোহরের ঘরে ঘরে একসময় শখ করে বানানো হতো এই নিরামিষ খাবার। কৈ, মাগুর, শোল মাছের ঝোলে কুমড়ো বড়ির সুখ্যাতি ছিল অতুলনীয়। কিন্তু সময় বদলেছে, আর সেই শৌখিনতা পরিণত হয়েছে পেশায়। এখন চাটমোহর অঞ্চলে দুই শতাধিক পরিবার কুমড়ো বড়ি উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত—নারীরা বানান, পুরুষরা বাজারজাত করেন—এই সমন্বয়ই বহু পরিবারকে স্বাবলম্বী করেছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বড়ি শুধু পাবনা নয়, ঢাকার কাঁচা বাজার, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় শহরগুলোতে যাচ্ছে। পাশাপাশি ইউরোপ, কানাডা, ইতালি, সৌদি আরব, ফ্রান্স ও দুবাইয়েও রপ্তানি হচ্ছে চাটমোহরের কুমড়ো বড়ি।

দোলং গ্রামের শিলা রানী জানালেন, প্রায় অর্ধশত বছর ধরে এই কাজ করছেন তিনি। অতীতে সারাদিন শিলপাটায় ডাল বাটতে হতো, এখন মেশিনে গুঁড়ো করার কারণে সময় ও শ্রম দুইই কম লেগে বেশি বড়ি তৈরি করা যায়। একই গ্রামের চাপা রানী ও মায়া জানান, পরিবারের পুরুষেরা ডাল ভিজিয়ে মেশিনে বেটে দেন; এরপর নারীরা পাকা চালকুমড়া, কালোজিরা, গোলমরিচসহ নানা মসলা মিশিয়ে সুতি কাপড় দিয়ে জিলেপির মতো আকৃতি দিয়ে টিন বা কাঠের পিঁড়িতে সাজিয়ে রোদে শুকান। তিন-চার দিনের রোদে তৈরি হয় সোনালি রঙের সুস্বাদু কুমড়ো বড়ি।

স্থানীয়রা জানান, প্রতি কেজি ডাল থেকে ৭৫০–৮০০ গ্রাম বড়ি তৈরি হয়। বাজারে ডালের ধরনভেদে প্রতি কেজির দাম পড়ে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা। মাসকলাই ও অ্যাংকর ডালের বড়ির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। পাইকাররা বিভিন্ন জেলা থেকে এসে বড়ি কিনে নিয়ে যান, তবে অর্ডারভিত্তিক বড়ির দাম কিছুটা বেশি পড়ে। শিলপাটায় পিষে তৈরি বড়ির আলাদা চাহিদা রয়েছে, কারণ স্বাদ ও ঘ্রাণে এগুলো আরও সমৃদ্ধ।

চাটমোহরের তরুণ কুমার জানান, প্রতিদিন একজন নারী ২০ কেজি ডালের বড়ি বানাতে পারেন। ভোরে শুরু করে সকাল ৯টার মধ্যেই বড়ি বানিয়ে রোদে দিয়ে দেওয়া হয়। আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত বড়ি বিক্রি হয়, আর এই মৌসুমী ব্যবসাই অসংখ্য নিম্নবিত্ত পরিবারের আয়-রোজগারের মূলভিত্তি—কারও ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা, কারও সংসারের নিত্যচাহিদা, আবার কেউ কেউ সংসারে এনেছেন উন্নতির সচ্ছলতা।

চালকুমড়া ও ডালের মিশ্রণে তৈরি কুমড়ো বড়ি যে শুধু সুস্বাদুই নয়, পুষ্টিকরও—তা জানালেন পুষ্টিবিদ কুমকুম ইয়াসমিন। তার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম মাসকলাই ডালে রয়েছে প্রচুর পটাসিয়াম, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও আয়রন। অন্যদিকে চালকুমড়া ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবার সমৃদ্ধ, যা যক্ষ্মা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও গ্যাস্ট্রিকসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় উপকারী। এই দুয়ের সমন্বয়ে তৈরি কুমড়ো বড়ি তাই পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি গ্রামের পরিবারগুলোর জন্য হয়ে উঠেছে আয়ের শক্ত ভরসা।

চাটমোহরের মাটির গন্ধমাখা হাতের তৈরি কুমড়ো বড়ি তাই শুধু খাবার নয়—এটি এক ঐতিহ্য, এক সংস্কৃতি, আর অসংখ্য মানুষের জীবিকার সাজানো পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত