প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ব্যাংক খাতে আলোচিত ঋণ অনিয়ম ও বড় করপোরেট ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বিতর্কিত ব্যবসায়িক গ্রুপগুলোর সঙ্গে সরকারের কোনো ধরনের সমঝোতা হয়নি এবং অর্থ পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বিরোধী দলীয় এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংসদে প্রশ্ন উত্থাপন করেন এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তিগত বা করপোরেট গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, ব্যাংক থেকে যারা অর্থ নিয়ে পরবর্তীতে তা ফেরত দেয়নি বা দেশের বাইরে চলে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এসব অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ দেশের ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের ঋণ অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকে বড় ঋণ খেলাপির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বড় অংশের ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একই সঙ্গে জনতা ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের ঋণ অনিয়ম নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তিনি জানতে চান, এসব ঋণ পুনরুদ্ধারে সরকারের কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে পুনরায় সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না। পাশাপাশি তিনি সরকারের সঙ্গে ওই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট—অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ব্যাংকিং খাতকে স্বচ্ছ কাঠামোর মধ্যে আনা। তিনি বলেন, যারা ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে ফেরত দেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও জানান, অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ চলছে। একদিকে সরকারি পর্যায়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বেসরকারি রিকভারি ফার্মগুলোকেও যুক্ত করা হয়েছে।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, অতীতের বিএনপি সরকারের সময় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে কোনো বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠেনি। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বাজার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে সংসদে দেওয়া জবাবে তিনি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করেননি। তবুও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশের ব্যাংক খাতে বড় ঋণ খেলাপি ইস্যু, যা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে আছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তারা মনে করেন, শুধু মামলা বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় করপোরেট ঋণ অনিয়ম অর্থনীতির ওপর বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করে। একদিকে ব্যাংকের তারল্য সংকট বাড়ে, অন্যদিকে সাধারণ গ্রাহকদের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তারা আরও বলেন, ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া যত দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে, ততই ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরে আসবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সংসদে দেওয়া অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী পক্ষের দাবি, বড় ঋণ অনিয়মের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
সরকারপক্ষ বলছে, বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে সংসদে অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য দেশের ব্যাংকিং খাত ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ইস্যু ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণ ও আর্থিক সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।