মজলুম জননেতা ভাসানীর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৮ বার
মজলুম জননেতা ভাসানীর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আজ ১৭ নভেম্বর, ২০২৫, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মাধ্যমে বাংলার কৃষক, মজুর এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অবিরাম সংগ্রাম করে যিনি। ১৯৭৬ সালের এই দিনে ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাকে তার প্রিয় ভাটিয়াপাড়া সন্তোষের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

মাওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তার জন্মভূমি টাঙ্গাইলের সন্তোষে ভাসানীর মাজারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিএনপি এই দিনটি শ্রদ্ধা ও স্মরণে পালন করছে। ভাসানীর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে তৈরি হওয়া নীতি ও আদর্শ আজও শিক্ষার্থীদের, রাজনৈতিক কর্মীদের এবং সমাজসেবীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জন্ম ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে। সিরাজগঞ্জে জন্ম হলেও তার জীবনের সিংহভাগ কাটে টাঙ্গাইলের সন্তোষে। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯১১ সালে, যখন তিনি মওলানা মোহাম্মদ আলীর সান্নিধ্যে এসে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং বিভিন্ন শিক্ষণীয় সমাজসংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা নেন। ১৯১৭-১৮ সালে প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে তুরস্কের সাহায্যে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য রেশমী রুমাল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯১৯ সালে কারাবরণও করেন। এই সময় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

ভাসানীর রাজনৈতিক কর্মযাত্রা শুধু তাত্ত্বিক বা সাংগঠনিক ছিল না, বরং তিনি সরাসরি জনগণের পাশে দাঁড়ান। ১৯২৫ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে আসাম ও পূর্ব বাংলার কৃষক ও মজুরদের স্বার্থে আন্দোলন গড়ে তোলেন। জমিদার ও সুদখোর মহাজনদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তিনি সরাসরি নেতৃত্ব প্রদান করেন। ১৯২৮ সালে কলকাতায় খিলাফত সম্মেলনে এবং ১৯২৯ সালে আসামের ভাসান চরে দ্বিতীয়বারের কৃষক-প্রজা সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিকে জনগণের সংগ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত করেন।

১৯৩৬ সালে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং আসামের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালে তিনি আসামে লাইন প্রথার বিরোধী আন্দোলন করেন এবং আসাম প্রাদেশিক পরিষদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালনা করেন। ১৯৪৭ সালের ৫ মার্চ আসামে আন্দোলনের ডাক দেন, এরপর বাংলাদেশের দিকে ফিরে এসে ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ পূর্ব বাংলার ব্যবস্থাপক সভায় বাংলা ভাষার পক্ষ সমর্থন করেন এবং পাকিস্তানে সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’ প্রকাশের উদ্যোগ নেন।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা করেন এবং সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে তিনি পল্টন ময়দানে জনসভা করে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বৃহৎ আন্দোলন পরিচালনা করেন। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে তিনি বিখ্যাত ‘আসসালামু আলাইকুম’ ঘোষণা দেন। এই সময় তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের কারণে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন এবং ২৬ জুলাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় ভাসানী দেশপ্রেমিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ১৯৬৬ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির পক্ষ থেকে ১৪ দফা দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৬৮ সালে আইয়ূব সরকারের পতনের লক্ষ্যে ‘দাবি সপ্তাহ’ পালন করেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব আহূত গোলটেবিল বৈঠক বর্জন করেন। ১৯৭০ সালে সন্তোষে ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলন এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরও ভাসানী দীর্ঘদিন গৃহবন্দি ছিলেন। কিন্তু গণমানুষের বিভিন্ন দাবি ও দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন চালানো থেকে থেমে থাকেননি। ১৯৭২ সালে সাপ্তাহিক ‘হক-কথা’ প্রকাশের মাধ্যমে দেশের মানুষের প্রতি সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা চালান। ৯ এপ্রিল ঢাকার পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জনসভা আয়োজন করে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দেন। ১৯৭৪ সালে দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ চলাকালে তার নেতৃত্বে ভাসানীর দেশব্যাপী ভুখা মিছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। ১৮ এপ্রিল ১৯৭৬ পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারেজের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দেন এবং ১৬ ও ১৭ মে রাজশাহী হতে কানসাট পর্যন্ত দীর্ঘমার্চের নেতৃত্ব দেন।

মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের বৈচিত্র্য ও সংযোগ শুধু রাজনৈতিক স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক এবং জনসংযোগকারীর ভূমিকাও পালন করেছেন। তার কর্মজীবন দেশের কৃষক ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার ইতিহাসে এক অম্লান দাগ রেখে গেছে।

আজ তার ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার স্মৃতিচারণ এবং কর্মমুখী উদযাপন সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের জন্য শিক্ষণীয়। টাঙ্গাইলের সন্তোষে মাওলানা ভাসানীর মাজারে রাজনৈতিক দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনরা নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। তার জন্মভূমিতে সাত দিনব্যাপী ভাসানীর মেলা আয়োজন করা হয়েছে, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষকে একত্রিত করছে। মেলা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার রাজনৈতিক জীবন, সামাজিক অবদান এবং মানবকল্যাণে তার অদম্য সংগ্রামের কাহিনী তুলে ধরা হচ্ছে।

মাওলানা ভাসানীর জীবন আজও প্রমাণ করে যে, গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই কখনো বন্ধ হয় না। তাঁর নেতৃত্ব এবং সাহসিকতা আজও নতুন প্রজন্মকে শিক্ষণীয় দিকনির্দেশনা দেয়। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর তার মৃত্যুর পর থেকে, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ভাসানী একটি চিরন্তন প্রতীক হয়ে আছে, যা দেশপ্রেম, ন্যায়বিচার এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণের প্রতীক হিসেবে প্রজ্বলিত হচ্ছে।

মাওলানা ভাসানীর এই মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তার স্মৃতিকে গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো হচ্ছে। ভাসানীর আদর্শ, সংগ্রাম ও অমোঘ ন্যায়বোধ আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং সামাজিক আন্দোলনের প্রাণসত্তারূপে জীবিত রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত