নিজের গড়া ট্রাইব্যুনালে হাসিনার মৃত্যুদণ্ড

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৭ বার
ভারতের দ্বিধা, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডে নতুন উত্তেজনা

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নাটকীয় ও প্রতীকী মোড়ঘোরানো মুহূর্তের জন্ম দিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর নিজ হাতে যে বিশেষ আদালতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শেখ হাসিনা, সেই আদালতই আজ তাকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এ রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্ক, অভিযোগ ও প্রতিশোধের বৃত্ত যেন এক আত্মসংঘর্ষের রেখায় এসে মিলিত হয়েছে। দেশ-বিদেশে এই রায় নিয়ে তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও উত্তাল প্রতিক্রিয়ায় ভরপুর।

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যাত্রা শুরু করে ঠিক সেই উদ্দেশ্যে—যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে একাত্তরের স্মৃতি, জাতীয় আবেগ এবং ক্ষমতার রাজনীতিকে জড়িয়ে একটি বহুল আলোচিত ও সমালোচিত অধ্যায় সৃষ্টি হয়। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী­র বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনার মধ্য দিয়ে আদালতটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ হিসেবে সমালোচিত হয়। তদন্ত প্রক্রিয়ার দুর্বলতা, সাক্ষ্যগ্রহণে অনিয়ম, বিচারকদের সম্ভাব্য পক্ষপাত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের অভিযোগ দেশে-বিদেশে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।

শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের সেই সময়কার বহু সিদ্ধান্ত এবং আদালতের কার্যপদ্ধতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা প্রকাশ করেছিলেন আন্তর্জাতিক অনেক মানবাধিকার সংস্থা। বিএনপির প্রয়াত নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিচার চলাকালীন একথা বলেছিলেন যে, “এ ট্রাইব্যুনাল যেন স্থায়ী থাকে। রাজনৈতিক ঋতু বদল হলে এখানে আবার বিচার হবে।” তার সেই মন্তব্য আজ নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যেন এক ভবিষ্যদ্বাণীর মতো বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

২০২৪ সালের ভয়াবহ জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে। ‘রাষ্ট্রীয় নির্দেশে গণহত্যা’—এ অভিযোগে সেদিনের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয় এবং হাজারো মানুষ আহত হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, স্কুলের কিশোর, শ্রমজীবী মানুষ এবং নানা বয়সের অসংখ্য নাগরিক। সেদিন রাজধানী থেকে জেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ রূপ নেয় গণবিদ্রোহে, যা সরকারের পতন ঘটায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে এবং বিচার এড়াতে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেন।

এ ঘটনার পর দেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তার পরই পুনর্গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে—যে ট্রাইব্যুনালের আইনই এক সময় সংশোধন করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার অভিযোগ উঠেছিল। তবে ২০২৪ সালে আনা সংশোধনীতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার চেষ্টা স্পষ্ট ছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণে ‘ওয়াইড স্প্রেড’ ও ‘সিস্টেমেটিক’ হত্যাকাণ্ডের সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়। রোম স্ট্যাটিউটের নির্দেশনা অনুযায়ী বিচারের মানদণ্ড স্থির করা হয়। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের বিধানও সংযোজিত হয়, যাতে ভুক্তভোগীরা অন্তত ন্যায়বিচারের কিছু প্রতিদান পেতে পারেন।

এই আইনের আওতাতেই শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ মামলা পরিচালনা করে। আদালতে দীর্ঘ ১১ মাস ধরে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন, তদন্ত প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত ইত্যাদি বিচার বিবেচনায় আনা হয়। শতাধিক আহত বিক্ষোভকারী আদালতে এসে সেদিনের ভয়ংকর স্মৃতি তুলে ধরেন। অনেকে হেলিকপ্টার থেকে চলমান গুলিবর্ষণের দৃশ্য বর্ণনা করেন, যা আদালতে উপস্থাপিত ভিডিও ও উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণেও মিল পাওয়া যায়।

যদিও শেখ হাসিনা আদালতের সমন পেয়েও হাজির হননি, তবুও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিয়ম অনুযায়ী অনুপস্থিতিতেই বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। বিচারের শেষ দিনে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি তুলে ধরে বলে, “এটি শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ।” আদালত তার রায়ে বলে, অভিযোগ তিনটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে তদন্তে সহযোগিতা করেছিলেন। এর ফলেই তাকে ‘লঘুদণ্ড’ হিসেবে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আদালত উল্লেখ করে যে, “তার সহযোগিতা তদন্তকে প্রাতিষ্ঠানিক করেছে এবং সত্য তুলে ধরতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।”

রায় ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায় দুই ধরনের প্রবল প্রতিক্রিয়া। নিহতদের পরিবার ও সাধারণ মানুষ বহুদিনের দুঃখ-কষ্টের প্রতিফলন হিসেবে রায়টিকে স্বাগত জানায়। সেই সব পরিবারের সদস্যরা বলেন, “আমাদের ছেলে-মেয়েদের রক্ত বৃথা যায়নি।” অনেকে আদালত চত্বরে আবেগে কেঁদে ফেলেন, কেউ বা বলেন, “যে আদালত তিনি গড়েছিলেন, সেই আদালতই তাকে বিচার করল—এটাই ন্যায়বিচারের শক্তি।”

অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলে রায় নিয়ে নতুন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে মনে করছেন, ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত তৈরি হলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধিরা বলেছেন, এই রায় রাজনৈতিক নয়, আইনগত; এবং ভবিষ্যতে কোনো সরকারই যেন আইনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেটিই এখন রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।

শনিবার সন্ধ্যার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি দেখা যায়। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই লিখেছেন, “বিচার মানেই প্রতিশোধ নয়; বিচার জাতিকে সঠিক পথে ফেরায়।” বিশেষত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে যারা ঘনিষ্ঠজন হারিয়েছেন, তাদের জন্য এই রায় মানসিক স্বস্তি বয়ে আনলেও ক্ষত এখনও গভীর।

রায়ের মর্মার্থ আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে এক কঠোর বার্তা দেয়। আদালত উল্লেখ করে যে, “রাষ্ট্রপ্রধান হলেও একজন নাগরিক আইনের ঊর্ধ্বে নন।” গণতন্ত্রে ক্ষমতা মানুষের হাতে থাকে, এবং তা কখনোই রক্তপাতের মাধ্যমে রক্ষণ করা যায় না—এই শিক্ষা নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনায় আরও গভীরভাবে স্থায়ী হবে বলে অনেকের ধারণা।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এক দশক পর একই ট্রাইব্যুনাল থেকে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় এসেছে। আদালতের ভেতর-বাইরে এই তুলনা আজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অনেকেই বলছেন, “ইতিহাস ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যে আদালত দিয়ে তিনি প্রতিপক্ষকে দমন করেছিলেন বলে অভিযোগ ছিল, সেই আদালতই তার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করল।”

রায় কার্যকরের আগে আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আপিলের সুযোগ খোলা থাকবে, যদিও অনুপস্থিত আসামির আপিল গ্রহণযোগ্য হবে কি না তা নিয়ে আইনবিদদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। তবে দেশজুড়ে এখন যে প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত—সেটি হলো রায় কার্যকর হবে কবে। নিহতদের পরিবার বলছেন, “আমরা বিচার পেয়েছি, তবে পূর্ণ স্বস্তি আসবে রায় কার্যকর হলে।”

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই রায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। যে ট্রাইব্যুনাল একসময় রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল বলে সমালোচিত ছিল, আজ সেই আদালত রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার শক্ত ভিত্তিতে নতুনভাবে দাঁড়িয়েছে। মানুষের রক্ত-স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত এই মুহূর্ত জাতির জন্য এক শিক্ষণীয় চিহ্ন রেখে গেল—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ন্যায়বিচার চিরকালীন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত