চবি সহকারী রেজিস্ট্রারকে ধরে মারধর ও থানায় সোপর্দ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৭ বার
চবি সহকারী রেজিস্ট্রারকে ধরে মারধর ও থানায় সোপর্দ

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে সহকারী রেজিস্ট্রার আবুল মনসুর শিকদারকে আটক, মারধর এবং পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বৃহস্পতিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ক্যাম্পাস এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। এর পরপরই শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বহুল আলোচিত ২০১৪ সালের হত্যাকাণ্ডের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলেও ঘটনাটি যেভাবে সংঘটিত হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ, ক্ষোভ ও বিচারের দাবিও উত্থাপিত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আবুল মনসুর শিকদার দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে কর্মরত। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক এবং ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন। প্রতিদিনের মতোই বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি অফিস শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন। দক্ষিণ ক্যাম্পাসের মসজিদের সামনে পৌঁছালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা তাঁর পথ রোধ করেন এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শারীরিকভাবে আঘাত করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন শিবিরের কয়েকজন কর্মী তাঁকে ধরাধরি করে হাটহাজারী থানায় নিয়ে যান। স্থানীয়দের দাবি, হামলার সময় আশপাশের শিক্ষক ও কর্মকর্তা কেউই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না, ফলে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাস্থলের একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় মনসুর শিকদারকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় ধস্তাধস্তির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, আবুল মনসুর শিকদারকে ২০১৪ সালে শিবির নেতা মামুন হোসেন হত্যার মামলায় আসামি করা হয়েছিল, এবং সেই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত বছর ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর মামলাটি পুনরায় সক্রিয় করা হয়। যদিও পুলিশের বক্তব্যে তাঁকে ‘গ্রেপ্তার’ বলা হচ্ছে, কিন্তু তাঁকে থানা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া এবং তাতে ছাত্রশিবিরের সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টি নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন জানান, বিকেল চারটার দিকে তিনি ঘটনাটি জানতে পারেন। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। তিনি একজন কর্মচারীকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে থানায় পাঠিয়েছেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বৈঠকে আলোচনা করা হবে।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মোহাম্মদ আলী দাবি করেন, “২০১৪ সালের হত্যাকাণ্ডে মনসুর শিকদার অন্যতম আসামি এবং তিনি ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন।” তিনি আরও বলেন, শিবিরের কোনো সংগঠিত অপারেশন ছিল না; বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী তাঁকে থানায় সোপর্দ করেছেন এবং এ সময় ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে বলে তারা শুনেছেন।

তবে মনসুর শিকদারের সহকর্মীরা বলছেন, এটি পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ এবং এটি ক্যাম্পাসে ভয়ের পরিবেশ তৈরির অংশ। অফিসার সমিতির সদস্যরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তাকে এভাবে তুলে নেওয়া নজিরবিহীন এবং এটি প্রশাসনিক স্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপর সরাসরি আঘাত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সহরাওয়ার্দী বলেন, মনসুর শিকদারকে ২০১৪ সালের মামলায় ৫ নম্বর আসামি করা হয়েছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নিহত মামুনের ভাই বাদী হয়ে মামলাটি পুনরায় সক্রিয় করেন। তিনি বলেন, পুলিশ তাঁকে যেভাবে গ্রেপ্তার করেছে, তা আদালতের নির্দেশনার আলোকে হয়েছে। তবে তিনি ঘটনাটি তদন্তের জন্য একটি প্রশাসনিক কমিটি গঠনের ইঙ্গিত দেন।

২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। ঘটনার সূত্রপাত হয় সিলেটে ছাত্রলীগ নেতা জালাল আহমেদের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করে। সংঘর্ষে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ও শিবির নেতা মামুন হোসেন নিহত হন এবং উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। সেই সময় ক্যাম্পাসজুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং মামলাটি বছরের পর বছর তদন্তে আটকে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত এক বছরে রাজনৈতিক পালাবদল ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটে নতুন অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। এর সঙ্গে ২০১৪ সালের মামলার নতুন করে সক্রিয় হওয়া ক্যাম্পাসে দলীয় উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। আবুল মনসুর শিকদারকে যেভাবে আটক ও সোপর্দ করা হয়েছে, তা রাজনৈতিক প্রতিশোধের আশঙ্কাও জাগিয়েছে।

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ছাত্রলীগ–শিবির উভয় সংগঠনই নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বিবৃতি দিয়েছে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পাস তাদের শিক্ষার জায়গা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তুলে নেওয়ার জায়গা নয়। তারা চান নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভবিষ্যতে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, উপাচার্যের সভাপতিত্বে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ করণীয় এবং ঘটনার আইনগত দিক নিয়ে আলোচনা হবে। এ ঘটনায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাসে রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন কিছু নয়, তবে কর্মকর্তাকে এভাবে তুলে নেওয়ার ঘটনা শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি বড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। ক্যাম্পাসে এখনো টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি কী দিকে মোড় নেবে—তা অনেকটাই নির্ভর করছে আইনগত প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত