প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইংলিশ চ্যানেলের জলসীমায় যুক্তরাজ্যের একটি পেট্রোল জাহাজ রাশিয়ার করভেট ‘আরএফএন স্টকই’ এবং ট্যাঙ্কার ‘ইয়েলনা’ আটক করেছে। সোমবার (২৪ নভেম্বর) সংবাদ সংস্থা এপি এই তথ্য জানিয়েছে। এই ঘটনা যুক্তরাজ্যের সমুদ্রসীমায় রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি করেছে।
ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রোববার (২৩ নভেম্বর) জানিয়েছে, গত দুই বছরে যুক্তরাজ্যের জলসীমার আশেপাশে রাশিয়ার নৌ কার্যক্রম প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তৎপরতা পরিমাপ করে দেখা গেছে, রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ এবং সহায়ক জাহাজগুলোর নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার সাবমেরিন এবং জাহাজ পর্যবেক্ষণ করার জন্য ব্রিটেন ন্যাটো মিশনের অংশ হিসেবে আইসল্যান্ডে তিনটি পোসাইডন পর্যবেক্ষণ বিমান মোতায়েন করেছে। এই বিমানগুলো মূলত রাশিয়ার সামরিক জাহাজ ও সাবমেরিন সনাক্ত ও নজরদারিতে সাহায্য করবে।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে যখন প্রতিরক্ষা সচিব জন হিলি জানিয়েছেন যে, রাশিয়ার গুপ্তচর জাহাজ ইয়ানতারব স্কটল্যান্ডের উপকূলে যুক্তরাজ্যের পর্যবেক্ষণ বিমানের দিকে লেজার ব্যবহার করে নজরদারি করছিল। হিলি এ ঘটনার সমালোচনা করে বলেন, এটি ‘অবিবেচক এবং বিপজ্জনক’। তিনি আরও জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য যে কোনো অনুপ্রবেশ প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত এবং তাদের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেবে। তিনি রাশিয়া ও পুতিনের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, “আমরা আপনাদের দেখছি। আমরা জানি কী করছেন।”
রাশিয়ার লন্ডনের দূতাবাস হিলির মন্তব্যের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের সরকারের উপর ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগ এনেছে। মস্কো দাবি করেছে, তাদের কোনো আগ্রহ নেই যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার এবং তারা এমন কোনো কার্যক্রমে জড়িত নয়। তবে ব্রিটিশ সরকার এই ধরনের দাবিকে অবহেলা করেছে এবং বলেছে, তাদের নজরদারি ও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়া অপরিহার্য।
এই ঘটনাটি ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা নীতি এবং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। হিলি বলেন, সাম্প্রতিক রাশিয়া, চীন এবং ইরানের হুমকির প্রেক্ষিতে বৃহৎ সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও এ সংক্রান্ত মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশকে সামরিকভাবে শক্তিশালী রাখতে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন, যার মধ্যে কর বৃদ্ধি ও সরকারি ব্যয় পুনর্বিন্যাস অন্তর্ভুক্ত।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, রাশিয়ার জাহাজ এবং সাবমেরিনের ক্রিয়াকলাপ শুধু সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা জন্যই ঝুঁকি তৈরি করছে না, বরং ন্যাটো মিশনের কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের জন্য আইসল্যান্ডে পর্যবেক্ষণ বিমান মোতায়েন করা গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পোসাইডন বিমানগুলো মূলত সাবমেরিন, যুদ্ধজাহাজ এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের সকল ধরনের সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইংলিশ চ্যানেলে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ আটক করার ঘটনা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি রাশিয়ার সামুদ্রিক কার্যক্রমকে সীমিত করতে পারে এবং পশ্চিমা ন্যাটো দেশগুলোকে সতর্ক করে। একই সঙ্গে এটি ব্রিটেনকে রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার লেজার-হুমকির ঘটনাটি যুক্তরাজ্যের সমুদ্রসীমায় নজরদারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছেন, এই ধরনের হুমকি মোকাবিলার জন্য পেট্রোল ও নজরদারি কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা সচিব হিলি বলেছেন, “আমরা সব ধরনের হুমকি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত। আমাদের লক্ষ্য হল দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা।”
এদিকে, রাশিয়ার প্রতিক্রিয়ায় লন্ডনের দূতাবাস উল্লেখ করেছে যে, ব্রিটেনের সরকারের বক্তব্য ভিত্তিহীন এবং মস্কোর উদ্দেশ্য যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা নয়। তবে ব্রিটিশ সরকার এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অবহেলা করতে নারাজ এবং সতর্কতার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
বিশ্বজনীন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইংলিশ চ্যানেলে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ আটক করা একটি স্পষ্ট বার্তা, যা দেখায় যে ব্রিটেন তাদের সমুদ্রসীমা রক্ষা করতে সক্ষম এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে দৃঢ়।
ঘটনার প্রেক্ষিতে, যুক্তরাজ্য ও ন্যাটো মিশন নতুন কৌশল প্রণয়ন করছে যাতে রাশিয়ার সামুদ্রিক কার্যক্রম নজরদারিতে রাখা যায়। এতে শুধু ব্রিটেনের নিরাপত্তাই নয়, পশ্চিমা বিশ্বের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তাও সুরক্ষিত হবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামনের দিনে এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার হতে পারে, বিশেষ করে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি বিবেচনা করে।
সংক্ষেপে, ইংলিশ চ্যানেলে রাশিয়ার করভেট এবং ট্যাঙ্কার আটক কেবল সামুদ্রিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতিক বার্তা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি রাশিয়াকে সতর্ক করার পাশাপাশি ন্যাটো ও যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। ভবিষ্যতে ব্রিটেনের নজরদারি ও সামরিক প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা হবে, যাতে এমন হুমকি মোকাবিলা করা সম্ভব হয় এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।