প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরের কাছে পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া আবারও জোরালোভাবে শুরু করেছে সরকার। তবে বিষয়টিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ভিন্ন একটি প্রশ্ন—মাত্র কয়েক মাস আগে যে ইস্যুতে বন্দর অচল করে দেওয়া হয়েছিল, সেই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন ও নেতারা এখন কেন নীরব?
বন্দর সংশ্লিষ্ট মহল, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এই প্রশ্ন এখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন আন্দোলন হয়েছিল। শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠন, বন্দর ব্যবহারকারী, রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন একযোগে মাঠে নেমেছিল। সেই আন্দোলনের চাপে সরকার শেষ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল।
কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে বর্তমান সরকার একই প্রক্রিয়া আবার শুরু করলেও আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে এখনো তেমন কোনো দৃশ্যমান কর্মসূচি দেখা যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ কার্যক্রম এই বন্দরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। আর এই বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর টার্মিনাল হচ্ছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল। গত বছর বন্দরে পরিচালিত মোট কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয়েছে এই একক টার্মিনাল থেকেই।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, দুবাইভিত্তিক আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ দরপত্র মূল্যায়ন এবং নেগোসিয়েশন কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নতুন কমিটি গঠনের অনুমোদন চেয়েছে।
এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া পুনরায় সক্রিয় হয়েছে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সুবিধা কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই বিদেশি অপারেটর নিয়োগের চিন্তা করা হচ্ছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক কোম্পানির অংশগ্রহণ বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হতে পারে।
তবে এই যুক্তির বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী মত রয়েছে। সমালোচকদের দাবি, দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে এনসিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি ব্যবস্থাপনায় গেলে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দেশীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে সম্প্রতি একটি দেশীয় কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব। জানা গেছে, কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এনসিটি পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, তারা এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছে যা বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য আর্থিকভাবে আরও লাভজনক হতে পারে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা বর্তমানে এমন পর্যায়ে রয়েছে যেখানে নতুন প্রস্তাব বিবেচনার সুযোগ সীমিত।
এদিকে এনসিটি বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড পরিচালনা করছে। তাদের দায়িত্ব গ্রহণের পর টার্মিনালের কার্যক্রমে ইতিবাচক অগ্রগতির তথ্যও সামনে এসেছে। গত মে মাসে এনসিটিতে এক লাখ ২৬ হাজারের বেশি টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা এক মাসের হিসাবে টার্মিনালটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এই সাফল্যের কারণে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—যদি দেশীয় ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম ভালোভাবে চলতে পারে, তাহলে বিদেশি অপারেটরের প্রয়োজনীয়তা কতটা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো আন্দোলনকারীদের বর্তমান অবস্থান। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যেসব সংগঠন বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নিয়েছিল, তাদের অনেকেই এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি।
এ কারণে সচেতন মহলের একাংশের মধ্যে সন্দেহ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, যদি তখন জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আন্দোলন যৌক্তিক হয়ে থাকে, তাহলে একই ইস্যুতে বর্তমান পরিস্থিতিতেও সমানভাবে সক্রিয় থাকার কথা ছিল। আর যদি বর্তমান বাস্তবতায় অবস্থান পরিবর্তন হয়ে থাকে, তাহলে তার ব্যাখ্যাও জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সুশাসন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলছেন, এনসিটি নিয়ে সরকারকে আরও স্বচ্ছ অবস্থান নিতে হবে। কেন বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের আমলে একই প্রকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা জনগণের জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের সম্ভাব্য সুফল, ঝুঁকি এবং আর্থিক প্রভাবও জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত।
অন্যদিকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন নেতা দাবি করেছেন, তারা এখনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে টার্মিনাল হস্তান্তরের বিরোধিতা করছেন। তবে তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা এবং আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছেন। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে কর্মসূচিও দেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। ফলে এনসিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিবেচনার ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, এনসিটি পরিচালনা নিয়ে সরকারের নতুন উদ্যোগ যেমন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি আন্দোলনকারীদের রহস্যজনক নীরবতাও নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। এখন নজর রয়েছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং এই ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থানের দিকে। কারণ, চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা শুধু একটি টার্মিনালের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।