ভিয়েতনামে তীব্র বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯০, নিখোঁজ অন্তত ১২

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩১ বার
ভিয়েতনামে বন্যায় প্রাণহানি

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভিয়েতনামের মধ্যাঞ্চলে টানা কয়েক দিনের তীব্র বৃষ্টিপাত এবং ভূমিধসের ফলে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৯০-এ পৌঁছেছে। এছাড়াও আরও অন্তত ১২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দেশটির পরিবেশ মন্ত্রণালয় রবিবার (২৩ নভেম্বর) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা দ্য গার্ডিয়ানও এই তথ্য প্রচার করেছে।

প্রতিবছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভিয়েতনামের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা থাকে। তবে এই বছরের অক্টোবরের শেষ দিক থেকে মধ্যাঞ্চলে অবিরাম ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। বিশেষত পার্বত্য দাক লাক প্রদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে এ পর্যন্ত ৬০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। প্রায়শই পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় ভূমিধসের ঝুঁকি বেশি এবং বন্যা এই অঞ্চলের বসতি ও কৃষি খাতকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।

দাক লাক প্রদেশের হাজার হাজার ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে অসংখ্য পরিবার তাদের বসবাসের স্থান হারিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতার মধ্যেও ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য ও উদ্ধার কার্যক্রম সীমিত রয়েছে। প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র গঠন করা হয়েছে, যেখানে প্রায় হাজার হাজার মানুষ স্থানান্তরিত হয়েছে। এই বন্যায় বহু পরিবার এখন খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সেবার তীব্র অভাবের মুখোমুখি।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দাক লাকসহ আরও পাঁচটি প্রদেশে ৮০ হাজার হেক্টরেরও বেশি ধান, শস্য ও অন্যান্য ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়াও প্রায় ৩২ লক্ষাধিক গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে বা পানিতে ভেসে গেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পাঁচটি প্রদেশে এই বন্যার কারণে আনুমানিক ৩৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।

দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্তত ২৭৯ জন নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে। এতে দুই বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবছর ভিয়েতনামে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বাড়ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে দৃশ্যমান করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার সময়কাল ও প্রভাব পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভূমিকম্প, ভূমিধসসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক ঝুঁকি তীব্র হচ্ছে।

ভিয়েতনামের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকাজ এখনও চলছে। সেনা ও স্থানীয় প্রশাসনের টিম বন্যা এবং ভূমিধসের পীড়িতদের উদ্ধারে তৎপর। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য খাবার, পানি ও ত্রাণ সরবরাহ করা হচ্ছে। তাছাড়া দেশটির বিভিন্ন মানবিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদান করছে।

স্থানীয় জনগণ জানাচ্ছেন, বন্যার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৌসুমী নদী ও জলাশয়ও ফেটে গেছে, যা পরিস্থিতি আরও গুরুতর করেছে। অনেক গ্রামের মানুষ এখন নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে জীবনযাপন করছেন। শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় স্কুল ও হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভিয়েতনামে বন্যার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতীতের তুলনায় ভারী বর্ষণ ও ভূমিধসের ফলে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। সরকারের পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তুতি সত্ত্বেও, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় এখনও যথেষ্ট সক্ষমতা নেই। বিশেষত পার্বত্য এলাকা এবং নীচু ভূমির শহরগুলোতে জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও গুরুতর।

সরকার এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী, খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তবে বর্ষার পানির উচ্চতা এবং পাহাড়ি এলাকা থেকে বন্যার পানি নামার কারণে উদ্ধারকাজে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেসব অঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে দ্রুত মানুষের নিরাপদ স্থানান্তর ও ত্রাণ বিতরণ করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, এই বন্যা কেবল প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং নগরায়ণ ও বনায়নের অভাবে পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের সমস্যা বাড়িয়েছে। শহুরে এলাকা, সড়ক এবং কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতা ঘটার কারণে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বহুগুণ বেড়েছে।

এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ভিয়েতনামের ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য ত্রাণ তহবিল এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বন্যার পরবর্তী পর্যায়ে পুনর্বাসন, হাসপাতাল ও স্কুলের সংস্কার, কৃষি পুনরুদ্ধার ও জনজীবনের স্বাভাবিকীকরণে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এই দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভোগ করছে। বন্যা, ভূমিধস ও ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য পরিকল্পিত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত