প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের জন্য অ্যাশেজের শুরুটা হয়েছে দুঃস্বপ্নের মতো। পার্থ টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইনিংস নয়, ঠিক তেমনই একপেশে ব্যবধানে দুই দিনের মধ্যেই ম্যাচ হারতে হয়েছে তাদের। ইংলিশ ব্যাটাররা মিচেল স্টার্কের গতি-সুইংয়ে ছড়িয়ে পড়েছেন কাগজের মতো, আর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনে ট্রাভিস হেড ঝড় তুলে একাই তুলে ফেলেছেন ১২৩ রান। তার বিধ্বংসী ইনিংসের সামনে দাঁড়ানোর মতো শক্তি বা পরিকল্পনা—কিছুইই যেন ছিল না ইংল্যান্ডের।
পার্থ টেস্টের এমন ভরাডুবি ইংল্যান্ডের সমর্থকদের হতাশায় ডুবিয়েছে। মাঠে উপস্থিত ইংলিশ ফ্যানরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, আর দেশ-বিদেশের বিশ্লেষকেরা তুলোধুনো করছেন দলকে। বিশেষ করে সাবেক তারকা জিওফ্রে বয়কট, যিনি ম্যাচের পর তীব্র সমালোচনায় বলেছেন, এই দলকে ‘স্টুপিড টিম’ হিসেবে বর্ণনা করলেও অত্যুক্তি হয় না। অ্যাশেজের মতো ঐতিহাসিক সিরিজের জন্য যে লড়াকু মানসিকতা প্রয়োজন, সেটি ইংল্যান্ড দেখাতে পারেনি বলে মনে করেন তিনি।
এত সমালোচনার পরও ইংল্যান্ড শিবিরে কিন্তু শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককলাম। তার মনোভাব স্পষ্ট—দল খারাপ খেলেছে ঠিকই, তবে এই ব্যর্থতা দলকে ভেঙে দেওয়ার মতো কিছু নয়। বরং সমর্থকদের আরও কিছুটা বিশ্বাস রাখতে হবে তাদের ওপর। দল যা দেখিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি সক্ষমতা তাদের আছে, এবং সিরিজে এখনো অনেক পথ বাকি।
ম্যাককলাম বিবিসিকে বলেন, “বিশ্বাস রাখো। মাঝেমধ্যে আমরা হেরে যাই, দেখতে খুব বিশ্রি লাগে। কিন্তু এমন সময়ও আসে যখন এই একই মানসিকতা আমাদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বকাপ রাখার মতো শক্তি দেয়। আমাদের শান্ত থাকতে হবে, একসঙ্গে থাকতে হবে এবং সিরিজের বাকি অংশের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।”
তার এই বক্তব্যে বোঝা যায়, অ্যাশেজের প্রথম ম্যাচটিকে তিনি এক ধরনের শিক্ষা হিসেবে দেখছেন। ম্যাচের প্রতিটি ভুল, পরিকল্পনার ঘাটতি—সবকিছুই নতুন করে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করেছে। তার মতে, এখনও অনেক ম্যাচ বাকি, এবং ইংল্যান্ডের এই দলটির সামর্থ্য নিয়ে তিনি দ্বিধাহীন।
ইংল্যান্ডের অন্যতম আলোচিত খেলোয়াড় জ্যাক ক্রলিকে ঘিরেও চলছে সমালোচনা। পার্থ টেস্টে দুই ইনিংসেই শূন্য রানে আউট হয়েছেন তিনি। ওপেনার হিসেবে তার ব্যর্থতা ইংল্যান্ডের পুরো ব্যাটিং অর্ডারকেই চাপে ফেলেছে। অনেকে বলছেন, ক্রলির জায়গায় পরিবর্তন আনা দরকার। কিন্তু ম্যাককলাম এই বিষয়ে খুবই পরিষ্কার অবস্থান নিয়েছেন—দল এখনো তাকে বিশ্বাস করে।
ম্যাককলাম বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, জ্যাক খুব ভালো খেলোয়াড়, বিশেষ করে এই ধরনের কন্ডিশনে এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। সে বাজেভাবে আউট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমরা তার ওপর আস্থা হারাইনি। মাঝেমধ্যে আপনি দ্রুত আউট হয়ে যাবেন—এটাই খেলার স্বাভাবিক নিয়ম। তবে যদি ক্রলি তার ইতিবাচক মানসিকতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে সে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বড় ক্ষতি করতে সক্ষম।”
ক্রলিকে ঘিরে বিতর্কটা নতুন নয়। তার টেকনিক, শট সিলেকশন, ধারাবাহিকতা—সবই প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তবে ম্যাককলামের কোচিং দর্শন ভিন্ন। তিনি খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা দেন, ব্যর্থতার ভয় দূর করেন এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর জোর দেন। তার মতে, কোনও খেলোয়াড় সাময়িক ফর্মহীনতায় পড়লে তাকে বাদ দেওয়া সমাধান নয়; বরং সময় দেওয়া জরুরি।
ইংল্যান্ডের আরও কিছু ইস্যু নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। পার্থ টেস্টে ব্যাটারদের টেকনিক্যাল ভুল, বোলারদের ধারাবাহিকতার অভাব, ফিল্ডিংয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ম্যাচের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। মিচেল স্টার্কের সুইং ও বাউন্সার সামাল দিতে ব্যাটাররা যে অপ্রস্তুত, তা দু’ইনিংসের পারফরম্যান্সই পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে ট্রাভিস হেডের সেঞ্চুরি যেন একাই ম্যাচের গতি পাল্টে দিয়েছে। ইংলিশ বোলারদের পরিকল্পনা, লাইন-লেংথ বা মানসিকতা—কোনোটিই হেডকে থামাতে পারেনি।
সমালোচনার ভারে যখন ইংল্যান্ড শিবির ভারাক্রান্ত, তখন ম্যাককলামের নেতৃত্ব দলকে দিচ্ছে মানসিক সাপোর্ট। তিনি মাঠের ভেতরের ও বাইরের দু’ধরনের চাপ নিয়েও কথা বলেছেন। তিনি জানেন, অ্যাশেজ ইংল্যান্ডের জন্য ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সেই চাপ কখনও কখনও খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে, যা ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভেঙে দেয় দৃঢ়তা।
এই পরিস্থিতিতে ম্যাককলাম বিশ্বাস জাগাতে চাইছেন। তার মতে, অ্যাশেজের মতো কঠিন সিরিজে প্রতিটি ম্যাচই নতুন শুরু। এক ম্যাচের পারফরম্যান্স পুরো সিরিজের মানদণ্ড নয়। ভবিষ্যতের ম্যাচগুলোতে ইংল্যান্ডের কাছে ফিরে আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, যদি খেলোয়াড়রা নিজেদের সামর্থ্যকে বিশ্বাস করতে পারেন।
ইংল্যান্ডের সমর্থকেরা অবশ্য হতাশ। তাদের প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন। ক্রিকেট ইতিহাসে অ্যাশেজ মানেই উত্তেজনা, লড়াই, অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড চিরন্তন প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সেখানে দুই দিনের মধ্যেই ম্যাচ হারানো শুধু ব্যর্থতা নয়, মর্যাদার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। তবুও সমর্থকদের প্রতি ম্যাককলামের অনুরোধ—দলকে সময় দিন। লড়াকু ইংল্যান্ড এখনো হারিয়ে যায়নি।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের বাকি ম্যাচগুলো তাই হবে মানসিক লড়াই, টেকনিক্যাল সংশোধন ও আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের পরীক্ষা। ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা কেমন বদলায়, খেলোয়াড়রা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেয়—সবকিছুই নির্ধারণ করবে অ্যাশেজের ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদী ম্যাককলাম দৃঢ়ভাবে বলছেন—“বিশ্বাস রাখো।”