জানুয়ারিতে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৯ বার
ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন প্রাণসঞ্চার করতে আবারও জানুয়ারিতে আয়োজন করা হচ্ছে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। ‘নান্দনিক চলচ্চিত্র, মননশীল দর্শক, আলোকিত সমাজ’—এই মূলমন্ত্র নিয়ে উৎসবের সব প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। আয়োজকদের মতে, এই উৎসব শুধু সিনেমা প্রদর্শনের অনুষ্ঠান নয়; বরং সমাজ ও সংস্কৃতির গভীর সংলাপের একটি মঞ্চ, যেখানে শিল্প, ভাবনা, দর্শন এবং বাস্তবতার মিলন ঘটে।

উৎসব পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামাল জানিয়েছেন যে, চলতি আসরে বিদেশী সিনেমার পাশাপাশি প্রদর্শিত হবে ৬৭টি দেশীয় চলচ্চিত্র, যা এবারকার আসরকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ করে তুলবে। দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে বৈচিত্র্য এসেছে, তা এই নির্বাচনের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে।

এই উৎসব অনুষ্ঠিত হবে রাজধানীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যুতে—বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তন ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তন। তিনটি ভেন্যুই প্রস্তুত করা হচ্ছে দর্শকদের স্বাচ্ছন্দ্য ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে। সারাদিনব্যাপী আলাদা আলাদা শো, প্রতিটি ভেন্যুর নিজস্ব পরিবেশ ও আলোক বিন্যাস—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।

এবারের উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ হবে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগ ‘বাংলাদেশ প্যানোরমা’, যেখানে নির্বাচিত হয়েছে দেশের ৮টি চলচ্চিত্র। এই বিভাগে প্রতিযোগিতা শুধু বিজয়ের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ভাষা, সমাজচিন্তা ও নির্মাণরীতির এক অনন্য প্রদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতি বছরই এই বিভাগে অংশ নেওয়া চলচ্চিত্রগুলো আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়ে থাকে। তাই বাংলাদেশের নির্মাতারা এই বিভাগে গুরুত্ব দিয়ে অংশগ্রহণ করেন।

পুরো উৎসবে থাকবে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ধারা ও অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে মোট ১০টি বিভাগ। এসব বিভাগের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার চলচ্চিত্র দর্শকদের সামনে আসবে। বৈচিত্র্যময় গল্প বলার ধরণ, নির্মাণ কৌশল এবং ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মিশেলে উৎসবটি হয়ে ওঠে এক আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সমাবেশ।

এবারের উৎসবে রয়েছে বড় একটি বিশেষ আয়োজন—‘চাইনিজ ফিল্ম উইক’। চীনা চলচ্চিত্র সাম্প্রতিক সময়ে বৈচিত্র্য, কারিগরি উৎকর্ষ ও গল্প বলার শক্তিতে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। এই উইকের মাধ্যমে দর্শকরা দেখতে পাবেন চীনের সমসাময়িক চলচ্চিত্র সংস্কৃতির রূপ, ভাষা ও শিল্প-ধারণা।

শুধু প্রদর্শনী নয়, উৎসবে রাখা হয়েছে তিনজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নির্মাতার মাস্টারক্লাস। তরুণ নির্মাতাদের জন্য এটি এক দুর্লভ সুযোগ, যেখানে তারা অভিজ্ঞ চলচ্চিত্র পরিচালকদের কাছ থেকে সিনেমা নির্মাণের গভীর জ্ঞান, ভাষা, চিন্তা এবং আন্তর্জাতিক ধারা সম্পর্কে জানতে পারবেন। এই মাস্টারক্লাস অনেক সময়ই আগামীর চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য পথ খুলে দেয়।

চলচ্চিত্র উৎসব মানেই আলোচনার নতুন দ্বার। উৎসব পরিচালক বলেন, “আমরা চাই এই উৎসব শুধু বিনোদনের ক্ষেত্র না হোক। দর্শক যেন সিনেমার মাধ্যমে সমাজকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ পায়। একটি ভালো চলচ্চিত্র মানুষের চিন্তা ও আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে।” তিনি আরও জানান, এবারের উৎসবের চলচ্চিত্রগুলো নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে চিত্রনাট্যের গভীরতা, নির্মাণ মান, সামাজিক মূল্য ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে।

১৯৯২ সালে শুরু হওয়া ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এরই মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার একটি মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর শতাধিক দেশ থেকে চলচ্চিত্র জমা পড়ে এবং উৎসবে প্রদর্শিত হয় শত শত সিনেমা। এতে অংশ নেয় দেশি-বিদেশি নির্মাতা, অভিনেতা, গবেষক, প্রযোজক ও সিনেমা–সংশ্লিষ্ট বহু পেশাজীবী। দর্শকের উপস্থিতি, আয়োজনের ভাবগাম্ভীর্য এবং চলচ্চিত্র নির্বাচন—সবই উৎসবকে ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

তাই এবারকার আসরেও থাকছে দর্শকবান্ধব সময়সূচি এবং মুক্ত প্রবেশাধিকারভিত্তিক সিটিং ব্যবস্থা। প্রদর্শনী দেখতে হলে দর্শককে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভেন্যুতে উপস্থিত থাকতে হবে, কারণ সিটিং হবে ‘প্রথম আসলে প্রথম পাবেন’ ভিত্তিতে। এ কারণে আয়োজকরা দর্শকদের সময়ের আগেই ভেন্যুতে পৌঁছানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

উৎসবে দর্শক, নির্মাতা ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মিলনমেলা জমে উঠবে প্রতিদিনের আলোচনা, প্রশ্নোত্তর, প্রদর্শনী-পরবর্তী মতবিনিময় এবং বিশেষ আয়োজনগুলোকে ঘিরে। নির্মাতারা নিজেদের সৃষ্টির অন্তর্নিহিত ভাবনা এবং নির্মাণ প্রক্রিয়া দর্শকদের সামনে তুলে ধরবেন, যা এই উৎসবকে আরও অর্থবহ করে তুলবে।

বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের গতি ও সম্ভাবনাকে নতুন করে প্রকাশ করার এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ধরা হয় এই উৎসবকে। নতুন নির্মাতাদের আত্মপ্রকাশ, অভিজ্ঞ নির্মাতাদের নতুন কাজ ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের সমন্বয়ে এটি হয়ে ওঠে চলচ্চিত্রচর্চার কেন্দ্র। দর্শকরাও বছরের এই সময়টিতে সিনেমার মাধ্যমে নিজের চিন্তা ও বোধকে আলোকিত করার সুযোগ পান।

এই বছরের আয়োজন আরও বেশি উজ্জ্বল ও পরিপূর্ণ হবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা। ভেন্যু প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত ব্যাবস্থা, প্রদর্শনের সময়সূচি—সব কিছুই এখন প্রায় চূড়ান্ত। শিগগিরই প্রকাশ পাবে পুরো সময়সূচি। উৎসব শুরু হওয়ার পর ঢাকা শহর পরিণত হবে রঙিন চলচ্চিত্র-দুনিয়ার এক সক্রিয় কেন্দ্রস্থলে।

এই আয়োজন শুধুই একটি বিনোদনমূলক উৎসব নয়—এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এবং দেশের সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রার প্রতীক। জানুয়ারির সেই উৎসবমুখর দিনগুলিতে দর্শক, নির্মাতা ও শিল্পমনস্ক মানুষের মিলনমেলা দেখে আবারও প্রমাণ হবে—চলচ্চিত্রই পারে সমাজকে আলো দেখাতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত