বিয়েবাড়ির খাবারে ট্র্যাজেডি: একজনের মৃত্যু, অসুস্থ ১৭

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
বিয়েবাড়ির খাবার বিষক্রিয়া

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নওগাঁর ধামইরহাটের একটি বিয়েবাড়িতে খাবার খেয়ে একজন অতিথির মৃত্যু এবং অন্তত ১৭ জন অসুস্থ হওয়ার ঘটনা স্থানীয় জনজীবনে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। গত রোববার উপজেলার আগ্রাদ্বিগুন বাজার এলাকায় অনুষ্ঠিত একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের খাবার খাওয়ার পর অতিথিদের মধ্যে বমি, পেটব্যথা, ডায়রিয়া ও মাথা ঘোরা অনুভূত হতে শুরু করে। অভিযোগ উঠেছে, ওই অনুষ্ঠানে পরিবেশিত খাবারের মান ও স্যানিটেশনজনিত ত্রুটির কারণে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তবে ঘটনাটি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্টরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

নিহত ব্যক্তির নাম মোজাফফর হোসেন, বয়স ৩৮ বছর। তিনি উপজেলার আগ্রাদ্বিগুন এলাকার দলিল উদ্দিনের ছেলে। বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায় ২৫০ জন অতিথিকে পরিবেশন করা হয়। অন্যদের মতো তিনিও অনুষ্ঠানের খাবার গ্রহণ করেন। খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শরীরে গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রথমে তাকে পত্নীতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই পথে তার মৃত্যু হয়। পরে সোমবার ভোরে তার লাশ বাড়িতে আনা হলে বিকেলে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়। তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

অসুস্থদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় পাওয়া গেছে—জয়দেব (৩৩), রেহেনা বেগম (৩৬), বাবু (১০), জাহিদুল (৩৮) এবং মোজাফফর (২৮)। তারা বর্তমানে পত্নীতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, তারা বমিভাব, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও পেটব্যথায় ভুগছেন। তবে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাদের অবস্থা এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন মোস্তাক জানান, আমিরুল ইসলামের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানকে ঘিরে আগ্রাদ্বিগুন এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু খাবার গ্রহণের পরপরই অতিথিদের মধ্যে একের পর এক অসুস্থতার ঘটনা ঘটতে থাকে। তিনি বলেন, তাঁর ফুফাতো ভাই নিহত মোজাফফরও অন্যদের মতো খাবার খাওয়ার পরই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি আরও জানান, বিয়েবাড়ির রান্নার কাজে কারা যুক্ত ছিলেন, কোথা থেকে উপকরণ আনা হয়েছিল এবং খাবার পরিবেশন কোন পরিস্থিতিতে হয়েছে—এসব বিষয় তদন্ত করা জরুরি।

পত্নীতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, মোট ১৮ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক, যাকে পরে জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা হয়। পথে তার মৃত্যু হয়। তিনি জানান, এটি খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনা হতে পারে, তবে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলতে আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। আক্রান্তদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখতে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন ঘটনার পরই বিয়েবাড়ির রান্নার স্থাপনা পরিদর্শন করে। খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খাবারের কোনো উপাদান পচে যাওয়া, রান্নায় ব্যবহৃত পানি দূষিত থাকা বা দীর্ঘ সময় খাবার সংরক্ষণ করে রাখার কারণে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে। বিশেষ করে বড় অনুষ্ঠানে খাবার প্রস্তুত করা এবং পরিবেশন করার ক্ষেত্রে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত না হলে দ্রুত খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ এলাকার অনেকেই মনে করছেন, বিয়ের মতো আনন্দঘন অনুষ্ঠানে এমন মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধে স্থানীয় হোটেল-রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার অর্ডার দেওয়ার সময় সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় পরিসরের সামাজিক অনুষ্ঠানে খাবার সঠিক মানে সংরক্ষণ, রান্না এবং পরিবেশন না করলে খাদ্যে বিষক্রিয়া বা ফুড পয়জনিং হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে গরম খাবার দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা হলে সালমোনেলাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু সৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে নিহত মোজাফফরের পরিবারের সদস্যরা শোকাহত। তারা বলছেন, একজন সুস্থ ব্যক্তি হঠাৎ করে খাবার খেয়ে মারা যাবেন—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া কঠিন। তারা সঠিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। স্থানীয়রা জানান, যেসব অনুষ্ঠান বড় পরিসরে আয়োজন করা হয়, সেগুলোর খাবার প্রস্তুতিতে আরও বেশি সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন।

এ ঘটনায় এলাকায় এখনো ভয় ও উদ্বেগের পরিবেশ। বিয়ের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। অনেকেই খাবারজনিত দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্তের ফল পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলছে।

ঘটনা তদন্তে বিশেষ টিম কাজ করছে এবং খাবার নমুনার পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া গেলে সঠিক কারণ জানা যাবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আক্রান্তদের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। তবে এই ঘটনা বড় অনুষ্ঠানে খাবার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত