বিশ্বরেকর্ড তাড়ার কঠিন পরীক্ষায় সিরিজ বাঁচাতে ভারত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৭ বার
কঠিন পরীক্ষায় সিরিজ বাঁচাতে ভারত

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঘরের মাঠে সিরিজে টিকে থাকার সংগ্রামে এখন এক কঠিনতম চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে ভারত। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গুয়াহাটি টেস্ট জিততে হলে স্বাগতিকদের গড়তে হবে ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রানতাড়ার বিশ্বরেকর্ড। ড্র করেও হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। বাকি আছে এক দিনের বেশি সময়, আর সেই সময়টুকু টিকে থাকাই এখন ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় পরীক্ষা।

গুয়াহাটির আসামের ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চতুর্থ দিনের খেলায় দক্ষিণ আফ্রিকা যে অবস্থানে গিয়ে তাদের ইনিংস ঘোষণা করল, তা ভারতীয় সমর্থকদের জন্য হতাশার খবর। ৫ উইকেটে ২৬০ রানে ইনিংস বন্ধ করে দেয় প্রোটিয়া শিবির। ত্রিস্তান স্ট্যাবস মাত্র ছয় রানের জন্য সেঞ্চুরি মিস করলেও তাঁর ব্যাট থেকে যেভাবে রান এসেছে, সেটিই দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসকে পাহাড়সম জায়গায় তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি পাওয়া থেকে সামান্য দূরে থেমে গেলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণটা পুরোপুরি তাঁরাই নিজেদের হাতে রেখেছেন।

এর আগে প্রথম ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকার লিড ছিল যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক। সেটি নিয়েই দ্বিতীয় ইনিংসে এসে আরও দাপট দেখায় তারা। ভারতের বোলারদের ওপর দাপট দেখিয়ে রান তুলতে থাকে প্রোটিয়া ব্যাটাররা। টেম্বা বাভুমা ইনিংস ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেন এমন সময়, যখন ম্যাচের রাশ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে। এই ঘোষণার意味ই ছিল স্পষ্ট—ভারতের সামনে এমন একটি লক্ষ্য রেখে দেওয়া, যা তাড়া করা প্রায় অসম্ভব।

এই টেস্ট জিততে এখন ভারতকে করতে হবে ৫৪৯ রান। টেস্ট ইতিহাসে চতুর্থ ইনিংসে এত বড় রান কোনো দল তাড়া করে জিততে পারেনি। সর্বোচ্চ তাড়া করে জয়ের রেকর্ডটি এখনও ওয়েস্ট ইন্ডিজের দখলে। ২০০৩ সালে অ্যান্টিগায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪১৮ রান তাড়া করে জয় পেয়েছিল তারা। সেই রেকর্ড আজও অটুট। ভারত যদি গুয়াহাটিতে এই ম্যাচ জিততে পারে, তবে সেই রেকর্ড ভেঙে তারা নতুন ইতিহাস গড়বে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তা একপ্রকার অসম্ভবই মনে হচ্ছে অনেকের কাছে।

শুধু রানের বিশালত্বই নয়, সময়ও ভারতের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্ভাব্য ১১০ ওভারের মধ্যেই এই রান তাড়া করে জিততে হবে স্বাগতিকদের। কেবল টিকে থাকা নয়, রান করতেও হবে প্রায় লিমিটেড ওভারের ম্যাচের মতো গতি ধরে রেখে। ভারতের ব্যাটসম্যানদের ওপর এর চাপে মানসিক ও কৌশলগতভাবে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে সুযোগ এসেছে আরও বড় সাফল্যের। ম্যাচ জিতে নিলে তারা ঘরের মাঠে ভারতের মতো শক্তিশালী দলকে হোয়াইটওয়াশ করার গৌরব অর্জন করবে। প্রোটিয়ারা এই সিরিজের প্রথম টেস্টটি কলকাতায় জিতে ইতোমধ্যে সিরিজ নিজেদের করে ফেলেছে। গুয়াহাটির ম্যাচ তাদের কাছে কেবল ইতিহাস গড়ার সুযোগই নয়; বরং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজেদের আধিপত্য দেখানোরও উপায়।

টেস্টের চতুর্থ দিনে খেলার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ দক্ষিণ আফ্রিকার নিয়ন্ত্রণে। ভারতীয় বোলাররা চেষ্টা করেও তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি। স্ট্যাবস নির্ভীকভাবে খেলেছেন, শর্ট বল, লেংথ বল—সবকিছুই দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন। তাকে সঙ্গত করে দলীয় রান বাড়িয়ে তুলেছেন সহ–ব্যাটসম্যানরাও। ভারতের বোলিং আক্রমণ ছিল একপ্রকার অদৃশ্য। জ্যাসপ্রিত বুমরা, মোহাম্মদ সিরাজ বা রবীন্দ্র জাডেজার কেউই ধারাবাহিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারেননি। বরং দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উইকেটে দাঁড়িয়ে খেলে গেছেন, এবং ভারতীয় সমর্থকদের জন্য চতুর্থ দিনটিকে আরও দীর্ঘ করে তুলেছেন।

ভারতীয় ক্রিকেটে গৌতম গম্ভীরের কোচিং–যুগ শুরু হয়েছিল আশাব্যঞ্জকভাবে। তবে এই সিরিজে দলটি যেভাবে নিজেদের চিন্তাভাবনায়, ব্যাটিং টেকনিকে এবং মানসিক প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়েছে, তা নজর কাড়ছে ক্রিকেট মহলে। দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের সামনে এমন লক্ষ্য রেখে দেওয়া হয়েছে, যা তাড়া করা তো দূরে থাক, ড্র করাও কঠিন। টিকে থাকতে হলে ব্যাটসম্যানদের দেখাতে হবে অসাধারণ ধৈর্য, বিচক্ষণতা এবং বিপুল মানসিক শক্তি।

ভারতের শীর্ষ ব্যাটসম্যানদের দিকে তাকিয়ে আছে গোটা দেশ। রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, শুভমান গিল, শ্রীয়াস আইয়ারদের সামনে লড়াইটা শুধু রান তাড়ার নয়; বরং সম্মান রক্ষারও। হোয়াইটওয়াশ এড়ানো এখনই ভারতের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং আক্রমণ—কাগিসো রাবাদা, এনরিখ নর্কিয়া, মার্কো ইয়ানসেনদের সামনে ভুল করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

গুয়াহাটি টেস্টের পিচ চতুর্থ দিনে এসে আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বল নিচু হতে শুরু করেছে, মাঝে মাঝে টার্ন করছে, আর স্পিডও অনিয়মিত। এই ধরনের উইকেটে দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটি সেশনই এখন ভারতের জন্য লড়াইয়ের। আর প্রোটিয়াদের জন্য এটি হয়ে উঠেছে সুযোগ—ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলে দ্রুত উইকেট তুলে নেওয়ার।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত যদি প্রথম দুই সেশনে উইকেট না হারিয়ে খেলে যেতে পারে, তবে ম্যাচ কিছুটা হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হতে পারে। তবে এত বড় লক্ষ্য তাড়া করতে হলে কেবল ধৈর্যই নয়, প্রয়োজন ইতিবাচক ক্রিকেট, ফাঁক পেলেই রান তোলার মানসিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগ।

একদিকে ব্যাট হাতে অসাধারণ দক্ষতা, অন্যদিকে মানসিক দৃঢ়তা—দুটি মিলিয়েই ভারতকে এই অসম যুদ্ধ লড়তে হবে। ক্রিকেটের ইতিহাস বলছে, চতুর্থ ইনিংসে বড় লক্ষ্য তাড়া করা মানে ব্যাটসম্যানদের বুদ্ধিমত্তার চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ভারত কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে তাদের মনোভাব, কৌশল এবং খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত স্কিলের ওপর।

সবশেষে বলা যায়, গুয়াহাটি টেস্ট এখন একদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য ইতিহাস গড়ার মঞ্চ, অন্যদিকে ভারতের মর্যাদা বাঁচানোর লড়াই। সিরিজ বাঁচাতে হলে ভারতকে এখন কেবল ভালো খেললেই চলবে না—তাদেরকে খেলতে হবে ইতিহাস সৃষ্টি করার মতো ক্রিকেট। আর এই চ্যালেঞ্জই দর্শকদের মনে বাড়িয়ে দিচ্ছে নাটকীয়তার উত্তেজনা, যা শেষ দিনে গিয়ে ম্যাচকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত