বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধ সাম্রাজ্য চালাচ্ছে মাস্টারমাইন্ড নিষ্ক্রিয় পুলিশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৯ বার
বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধ সাম্রাজ্য চালাচ্ছে মাস্টারমাইন্ড নিষ্ক্রিয় পুলিশ

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে গত এক বছরে যে অস্থিরতা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক নেটওয়ার্ক, যার বড় অংশই দেশের বাইরে অবস্থান করে। খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ কিংবা জমি দখলের নির্দেশনা আসছে ভারত, সৌদি আরব, ওমান, দুবাই ও কাতারে থাকা সিম নম্বরের মাধ্যমে। সেই নির্দেশ পৌঁছাচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ও টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপটেড অ্যাপে, যেগুলোর কল ও ভয়েস নোট পুলিশ এখনো কার্যকরভাবে ট্র্যাক করতে পারে না। ফলে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড পুলিশি নজরের সামনে থেকেও হয়ে উঠেছে প্রায় অদৃশ্য।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, গত বছরের ৪১টি হত্যাকাণ্ডের অন্তত ২১টির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত এমন ব্যক্তিরা, যারা বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে এসব অ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়ে আসছে। এসব অ্যাপের এনক্রিপশন ভেদ করার মতো সক্ষমতা না থাকায় পুলিশ ঘটনাস্থলের খুব কাছাকাছি থেকেও সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করতে পারছে না। ফলে একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তে কারা এর পেছনে রয়েছে তা জানা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

গোয়েন্দা পুলিশের গবেষণা বলছে, চট্টগ্রামে বর্তমানে সক্রিয় কমপক্ষে ১৪টি গ্রুপের মধ্যে ৯০ শতাংশ সদস্যই এসব বিদেশি নম্বরনির্ভর অ্যাপে যুক্ত। এলাকার অপরাধচক্রগুলো একদিকে নিজেদের স্থানীয় শেকড় শক্ত রেখেছে, অন্যদিকে প্রবাসী সিমধারী মাস্টারমাইন্ডদের সঙ্গে একটি নিরাপদ ভার্চুয়াল সংযোগ বজায় রেখেছে। অপরাধের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপেই এনক্রিপটেড ভয়েস নোট বা কল ব্যবহার করা হচ্ছে। যে কারণে অপরাধের পরপরই তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তদন্ত স্থবির হয়ে পড়ে।

পুলিশের সর্বশেষ তালিকায় দেখা যায়, হাটহাজারী, রাউজান ও বায়েজিদ এলাকায় সক্রিয় সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অপরাধ পরিচালনা করে আসছে। পাহাড়তলী ও ইপিজেড এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করছে আজিজ বস গ্রুপ। বায়েজিদ ও জালালাবাদ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেছে সাজ্জাদেরই আরেক সহযোগী রায়হান আলম গ্রুপ। চান্দগাঁওয়ে সক্রিয় শহিদুল ইসলাম বুইস্সা গ্রুপ ও পাঁচলাইশ–চান্দগাঁও এলাকায় মোবারক হোসেন ইমন গ্রুপ—সব মিলিয়ে পুরো শহরজুড়ে একটি জটিল ও ছড়িয়ে থাকা অপরাধ মানচিত্র তৈরি হয়েছে।

গোয়েন্দাদের ধারণা, প্রতিটি গ্রুপেরই রয়েছে তিন থেকে পাঁচজন করে বিদেশে থাকা মাস্টারমাইন্ড, যারা নিরাপদ ভার্চুয়াল চ্যানেলের মাধ্যমে স্থানীয় সদস্যদের নির্দেশ দেয়। তাদের মধ্যে অনেকে বিদেশেই অবস্থান করে ফেলেছে স্থায়ীভাবে, ফলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতেও বাড়ছে জটিলতা। শুধু প্রবাসী মাস্টারমাইন্ডই নয়, এসব গ্রুপের কয়েকটির রয়েছে নিজস্ব হ্যাকার, যারা নম্বর ক্লোনিং, ভুয়া লোকেশন তৈরি এবং বিদেশি সিম সক্রিয় করার মতো কাজগুলোতে সহায়তা করে থাকে।

চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষকেও প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হচ্ছে এ ভার্চুয়াল হুমকির। গত এক বছরে যাদের জীবনের ওপর সরাসরি হুমকি এসেছে, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হুমকিগুলো এসেছে বিদেশি নম্বর থেকে, অপরিচিত কণ্ঠে, এনক্রিপটেড ভয়েস নোটে। পাথর ব্যবসায়ী ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম জানান, ভারত ও ফ্রান্সের নম্বর থেকে তাকে বারবার ভয় দেখানো হয়েছে। রায়হান নামে পরিচিত এক ব্যক্তি তাকে গুরুতর ক্ষতির হুমকি দেয়। একইভাবে বায়েজিদের চালিতাতলীতে খুন হওয়া সরওয়ার হোসেন বাবলার ছোট ভাই ইমরান খান আজিজ তিন দেশের নম্বর থেকে হুমকি পেয়েছিলেন। কালুরঘাট ও পাঁচলাইশ এলাকার আরও দুই ব্যবসায়ীও একই পরিচয়ে ভয়ানকভাবে আতঙ্কিত হয়েছেন। তাদের অনেকের কাছেই এসব হুমকির অডিও রেকর্ড সংরক্ষিত আছে।

পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শতাধিক মানুষকে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেওয়া হয়েছে। চলতি বছর নগরজুড়ে সংঘটিত আটটি হত্যাকাণ্ডে বড় সাজ্জাদ গ্রুপের রায়হান আলম, মোবারক ইমন ও শহিদুল ইসলাম বুইস্সার নাম এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে। কিন্তু এখনো তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। কারণ, তাদের প্রতিটি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এনক্রিপটেড কল, ভুয়া লোকেশন এবং সিম ক্লোনিংয়ের মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে।

চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতু বিষয়টি স্পষ্টভাবে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা এখন শুধু অস্ত্র নয়, প্রযুক্তিকেও ব্যবহার করছে ঢাল হিসেবে। তারা বিদেশি সিম, ক্লোনিং, ডার্কনেট–ভিত্তিক যোগাযোগ—সবকিছু মিলিয়ে এমন এক দেয়াল তৈরি করেছে, যেটা ভেদ করা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন। তবে অসম্ভব নয়। পুলিশ নিজস্ব সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেই চেষ্টা করে যাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, অপরাধীদের নিজস্ব একটি ‘ক্রিমিনাল সোসাইটি’ রয়েছে। সেখানে এক গ্রুপ অপর গ্রুপের কাজকর্ম সম্পর্কে সব জানে। অনেক সময় জেলখানায় অবস্থানরত অপরাধীদের কথাবার্তা থেকেও বড় ধরনের তথ্য পুলিশের হাতে আসে। কিন্তু যত তথ্যই পাওয়া যাক, মাঠে তা কাজে লাগাতে গিয়ে পুলিশ পড়ে যায় প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার দেয়ালে।

এনক্রিপটেড যোগাযোগ ট্র্যাক করার সক্ষমতা দেশের কেবল একটি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে থাকায় জেলা–উপজেলা পর্যায়ের পুলিশ প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে দেরিতে সাড়া পায়। সংস্থাটির নিজস্ব নীতিমালা, কর্মব্যস্ততা ও অগ্রাধিকারভিত্তিক দায়িত্বের কারণে মাঠে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা অনেক সময় অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পান না। অন্যদিকে যেসব উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মনিটরিং সিস্টেম, ডিপ–প্যাকেট ইন্সপেকশন বা ট্র্যাকিং সফটওয়্যার প্রয়োজন—সেগুলো এখনো পুলিশের অবকাঠামোর বাইরে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া বা অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রগুলো প্রযুক্তিগত ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। পুলিশি অভিযান অনেক সময় ঘটনার পরের ধাপেই শুরু হয়, যখন অপরাধীরা দেশ–বিদেশের ভার্চুয়াল যোগাযোগ ভেঙে নিরাপদে সরে গেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষায়, বাংলাদেশের সাইবার ক্রাইম ও সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডকে কার্যকর করতে হলে পুলিশের নিজস্ব পর্যায়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

বিশেষজ্ঞরাও একই কথা বলছেন। তাদের মতে, চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড এখন পুরোপুরি ‘ডিজিটাল শিফট’-এ চলে গেছে। এই নেটওয়ার্ককে থামাতে হলে এ মুহূর্তে প্রয়োজন অত্যাধুনিক ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক অ্যাপ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তথ্যচুক্তি, এবং পুলিশের সাইবার গোয়েন্দা ইউনিটের সক্ষমতা বাড়ানো। নইলে অদূর ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে যেতে পারে ভার্চুয়াল মাস্টারমাইন্ডদের হাতে, যাদের অবস্থান দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে। তখন তাদের থামানো আরও কঠিন হয়ে উঠবে, যার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

চট্টগ্রামের মানুষের উদ্বেগও দিন দিন বাড়ছে। কারণ, অপরাধীরা যেভাবে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি বানিয়ে ফেলেছে, তা ভাঙতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে প্রযুক্তিগত লড়াই ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা জটিল অপরাধ নেটওয়ার্ককে ভাঙতে হলে প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—যা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত