প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আগামীকাল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় একটি রাজনৈতিক এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ন রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলার রায় আগামী বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হবে। এই রায় বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক মহল, জনসাধারণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের চোখ এখন আদালতের দিকে নিবদ্ধ।
ঢাকার পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন রায় ঘোষণার দায়িত্ব পালন করবেন। আদালত সূত্র জানায়, গত ২৩ নভেম্বর এসব মামলায় রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে পলাতক আসামিদের উপস্থিত না থাকায় তারা আত্মপক্ষ উপস্থাপন করতে পারেননি এবং নিজের নির্দোষ দাবি করার সুযোগও পাননি। দুই দিন পর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলি খান মো. মাইনুল হাসান জানান, “শেখ হাসিনা সহ ২৩ আসামির সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন প্রত্যাশা করছি। আমরা আশা করি আদালত থেকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হবে।” অন্যদিকে, একমাত্র কারাগারে থাকা আসামি রাজউক কর্মকর্তা খুরশীদ আলমের আইনজীবী মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, খুরশীদ আলম এই মামলায় জড়িত নন। তিনি বলেন, “প্লট বরাদ্দের সময় তার ওপর কোনো দায়িত্ব বা সুবিধা প্রয়োগ হয়নি। সে কোনো পদোন্নতি বা বেনিফিট গ্রহণ করেনি। তাই আশা করি, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির মাধ্যমে খালাস পাবেন।”
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে রাজউক প্লট বরাদ্দের বিষয়কে কেন্দ্র করে পৃথকভাবে ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলার আসামিদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা এবং তার সন্তানরা—টিউলিপ রিজওয়ান সিদ্দিক, রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক। এ ছাড়া আরও অনেক সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজউকের বিভিন্ন পদে থাকা কর্মকর্তারা এই মামলার অন্তর্ভুক্ত।
সাবেক সচিব ও অতিরিক্ত সচিব, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সিনিয়র সহকারী সচিব, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান ও সদস্যরা এই মামলার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এই মামলায় খুরশীদ আলম ছাড়া অন্যরা পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে যুক্তিতর্ক দেওয়া হয়নি। চার মাস ধরে চলা সাক্ষ্যগ্রহণে মোট ৯১ জন সাক্ষীর জেরা গ্রহণ করা হয়েছে। এই সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে আদালত মামলার প্রমাণাদি পর্যবেক্ষণ করেছে।
বিচারক আদালতে অভিযোগ গঠন করেছেন গত ৩১ জুলাই। আদালতে অভিযোগ গঠনের সময় বলা হয়, পূর্বাচল প্রকল্পের প্লট বরাদ্দে বেশ কিছু কর্মকর্তা ও সরকারি ব্যক্তিরা বেআইনি সুবিধা গ্রহণ করেছেন। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় পলাতক আসামিদের উপস্থিতি না থাকায় আত্মপক্ষ শুনানিতে তারা অংশ নিতে পারেননি। খুরশীদ আলম আত্মসমর্পণ করার পর আদালতে নিজের নির্দোষ দাবি করেছেন।
দুদকের মামলা ও আদালতের রায়ের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে উত্তেজনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রায় দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করবে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধ এই ধরনের মামলার রায় গণতান্ত্রিক এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
শেখ হাসিনা পরিবারের পাশাপাশি মামলায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার, অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সরকার, সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা এবং অন্যান্য কর্মকর্তা। এছাড়া সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিবও মামলার অন্তর্ভুক্ত।
বিচারকরা আদালতে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিস্তারিতভাবে সাক্ষীদের বক্তব্য নেন এবং প্রমাণাদি যাচাই করেন। মামলার তিনটি অংশের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে এবং পলাতক আসামিদের অংশগ্রহণ ব্যতীত আত্মপক্ষের শুনানি হয়েছে। আদালতের এই রায় প্রমাণের ভিত্তিতে দেওয়া হবে।
রাজউক প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত মামলাগুলো দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ এই রায়কে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহি প্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখছে।
এদিকে, প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত বাকি তিনটি মামলার বিচার ঢাকার চার নম্বর বিশেষ জজ মো. রবিউল আলমের আদালতে চলমান রয়েছে। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা এবং তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। আগামী ১ ডিসেম্বর ওই মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে। এছাড়া শেখ রেহানার দুই সন্তানের বিরুদ্ধে দুটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের শুনানি এখনো চলমান।
সংক্ষেপে, আগামীকাল রায় ঘোষণার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন একটি অধ্যায় লেখা হতে যাচ্ছে। এটি কেবল সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের জন্য নয়, বরং দেশের আইন, বিচার ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। রায়ের প্রতিক্রিয়া এবং তাৎক্ষণিক প্রভাব আগামী দিনগুলোতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনগণের মনোভাবকে প্রভাবিত করবে।