ডেঙ্গুতে আরও ৭ জনের মৃত্যু, বাড়ছে উদ্বেগ ও হাসপাতালের চাপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭ বার
Dengue

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহতার দিকে এগোচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ৭ জনের মৃত্যু এবং ৫৬৭ জন রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭৭ জনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক সচেতনতার ঘাটতি ডেঙ্গুর প্রকোপকে দীর্ঘায়িত করছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।

সরকারি তথ্যমতে, মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হলেও আক্রান্তের হারও কম নয়। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৫৬৭ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে। সবচেয়ে বেশি ভর্তি এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে রাজধানী ঢাকায়, যেখানে জনঘনত্ব, পানি নিষ্কাশন সমস্যা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গু বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায়—মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত—ঢাকা বিভাগেই সর্বাধিক রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য স্বাস্থ্য দপ্তর নিশ্চিত করেছিল।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, যেকোনো সময় রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। মৌসুমি বৃষ্টিপাত, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বাড়ির ভেতরের জমে থাকা পানি—সব মিলিয়ে এডিস মশার জন্য আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করছে। চিকিৎসকদের মতে, রোগীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি জটিলতা নিয়েও হাসপাতালে আসছেন অনেকে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তদের ঝুঁকি বেশি। হাসপাতালে জায়গা এবং চিকিৎসা–সুবিধার ওপর চাপ বাড়ছে প্রতিদিন।

গত বছরের পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ভয়াবহতার প্রমাণ দেয়। ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এক লাখ ১ হাজার ২১৪ জন, আর মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫৭৫। তুলনামূলকভাবে ২০২৫ সালের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকলেও বর্ষা মৌসুমের পর পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে। এ বছরের এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৩৭৭—যা অনেকের মতে বছরের বাকি সময়টুকুর জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।

রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড তৈরির নির্দেশনা থাকলেও অধিকাংশ হাসপাতালে জায়গার সংকট প্রকট। অনেক স্থানে একই বিছানায় দুইজন রোগী রাখতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসকরা। কোথাও কোথাও করিডোরে অতিরিক্ত বেডের সারি তৈরি করা হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের ওপরও চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ।

ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক জানান, রোগীদের মধ্যে এখন হেমোরেজিক ডেঙ্গুর মাত্রা বেড়েছে, যেখানে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তক্ষরণ দেখা দেয়। এমন রোগীদের চিকিৎসায় দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং সঠিক মনিটরিং অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সে সক্ষমতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন নগর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ওষুধ ছিটানো ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসের কার্যক্রম চালালেও নাগরিকদের অংশগ্রহণ যথেষ্ট নয় বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ফাঁকা ড্রাম বা এয়ার কন্ডিশনারের পানি জমে থাকা জায়গা—এসবই এডিস মশার জন্মক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, ব্যক্তিগত সচেতনতাও এডিস নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার বিভিন্ন নির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তবে স্বাস্থ্যসেবা খাতের অভিজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি ব্যবস্থাপনায় রোগীর চাপ সামলানো সম্ভব হলেও ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে দীর্ঘমেয়াদি শহর–পরিকল্পনার সংস্কার অপরিহার্য। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নালা–নর্দমার অস্বচ্ছল প্রবাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—এসব সমস্যা সমাধান না হলে একই পরিস্থিতি প্রতি বছর ফিরে আসবে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত তারা প্রথমে হালকা জ্বর, শরীরে ব্যথা, মাথাব্যথা বা বমিভাবকে গুরুত্ব দেন না। অনেক সময় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা দেরি করে হাসপাতালে আসেন, যা জটিলতা বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ, যেকোনো অস্বাভাবিক জ্বরকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত। প্রয়োজন না হলে স্যালাইন, প্লেটলেট বা অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণে বিরত থাকার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।

মৃতদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় অনেক পরিবার শোকাহত। কাজে ব্যস্ত নগরবাসী বা নিম্ন–আয়ের মানুষের পক্ষে নিয়মিত নিজের বাড়ি বা আশপাশ পরিষ্কার রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁদের উদ্বেগ, ডেঙ্গু শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে। হাসপাতাল–খরচ, ওষুধ, কর্মঘণ্টা ক্ষতি—সব মিলিয়ে অনেক পরিবার বিপদে পড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলেছেন, ডেঙ্গু এখন শুধু মৌসুমি রোগ নয়; বরং সারাবছরই এডিস মশার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার উষ্ণতা এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এডিস মশার বিস্তারকে সহজ করে তুলছে। তাই সামনের বছরগুলিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসক, নগর পরিকল্পনাবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু মশা নিধন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে নগরায়ণ ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা এবং জনসচেতনতার উন্নয়ন—সব মিলিয়ে একাধিক পদক্ষেপ একসঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত বেড, প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত নিশ্চিত করা জরুরি।

গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গু বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। মৃত্যুর মিছিল থামানোর জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যেমন দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন, তেমনি নাগরিক পর্যায়েও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সচেতন আচরণ জরুরি। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই এখন আর শুধু রোগ প্রতিরোধের লড়াই নয়—এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নগরায়ণ ও জনসচেতনতার সামগ্রিক সক্ষমতার পরীক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত