পাবনা-৩: একই পরিবারের তিন ভাইবোন তিন মেরুতে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬০ বার
পাবনা-৩: একই পরিবারের তিন ভাইবোন তিন মেরুতে

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাবনা-৩ (চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর) আসনে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থানীয় রাজনীতির অদ্ভুত চিত্র দেখা যাচ্ছে। একই পরিবারের তিন ভাইবোন এই আসনে তিনটি ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছেন, যা স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক ও সরগরম প্রচারণার সূচনা করেছে। এই তিন ভাইবোন হলেন চাটমোহর উপজেলা বিএনপির প্রয়াত নেতা হাজী আক্কাছ আলী মাস্টারের বড় ছেলে আলহাজ হাসানুল ইসলাম রাজা, তৃতীয় পুত্র মো. হাসাদুল ইসলাম হীরা এবং বড় মেয়ে অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা।

বুধবার, ৫ আগস্ট থেকে রাজা সক্রিয়ভাবে পাবনা-৩ আসনে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। তিনি বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠে নামলেও, অতীতের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তার নাম ইতিমধ্যেই পরিচিত। ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়ে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছেন। স্থানীয় গ্রাম, হাট-বাজার, মাঠ এবং দোকানপাটে তার প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। রেকর্ডকৃত বক্তব্য সর্বত্র মাইকে সম্প্রচার করা হয়, যা স্থানীয় জনগণকে সরাসরি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্ত করেছে। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহীনকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া হলে রাজা নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন।

তৃতীয় ভাই, হাসাদুল ইসলাম হীরা দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় বিএনপির ঘোষিত আন্দোলন ও সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তার সুনাম রয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে তিনি একাধিক মামলার শিকারও হয়েছেন এবং হাজতবাসও করেছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে প্রচারণা চালালেও দল যদি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহীনকে মনোনয়ন দিত, তখন তিনি স্থানীয় প্রার্থীর দাবিতে মশাল মিছিল ও বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন।

বৃহত্তর পরিবারে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বড় মেয়ে আরিফা সুলতানা রুমা ৯০-এর দশকে ঢাকায় প্রথমে ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রদল এবং পরে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্দোলনের কারণে একাধিক মামলার আসামি হয়ে তিনি কারাবাসও ভোগ করেছেন। চাটমোহরের মেয়ে হিসেবে স্থানীয় রাজনীতিতেও তার শক্ত অবস্থান রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও দল যদি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহীনকে মনোনয়ন দেয়, তখন রুমা দলকে সমর্থন দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে পাবনা-৩ এলাকায় বিরতিহীনভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিন ভাই-বোনের এই ভিন্নমেরু অবস্থান স্থানীয় রাজনীতিতে নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “একই পরিবারের তিন প্রার্থী যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তখন ভোটারের কাছে তা নতুন দিক উন্মোচন করছে। তারা তিনটি আলাদা রাজনৈতিক শক্তি এবং দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে নির্বাচনী মাঠে প্রবেশ করেছেন। এতে ভোটারদের মনোনয়ন ও সমর্থন নিয়ে দ্বিধা তৈরি হচ্ছে।”

পাবনা-৩ আসনে এই পরিবারের প্রভাব দীর্ঘকাল ধরে বজায় রয়েছে। সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য আলহাজ কে এম আনোয়ারুল ইসলামও দুইবার এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু দল তার মনোনয়ন না দিলে তিনি হাসাদুল ইসলাম হীরার সাথে যৌথভাবে কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহীনের মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম চালাচ্ছেন। এ কারণে পাবনা-৩ এলাকায়, বিশেষ করে চাটমোহরে, বিএনপির রাজনীতিতে প্রকাশ্যে দ্বিধাবিভক্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আনোয়ারুল ও হীরা সম্প্রতি একাধিক মশাল মিছিল থেকে ঘোষণা দিয়েছেন, প্রার্থী পরিবর্তন না হলে তারা কেউ একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন।

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া এবং ফরিদপুর উপজেলায় মোট ৪ লাখ ৮১ হাজার ৯৬২ জন ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে চাটমোহর উপজেলায় ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৫৬ হাজার ৮৪১ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২৮ হাজার ৬৪৬ এবং মহিলা ১ লাখ ২৮ হাজার ১৯৫ জন। ভাঙ্গুড়া উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৮ হাজার ৭৭৮, যেখানে পুরুষ ভোটার ৫৪ হাজার ২৬২ ও মহিলা ৫৪ হাজার ৫১৩ জন। ফরিদপুর উপজেলায় ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজার ৩৪৩, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫৮ হাজার ১৮৩ এবং মহিলা ভোটার ৫৮ হাজার ১৫৬ জন। এই ভোটার সংখ্যার বিশদ প্রকাশ প্রমাণ করে, পাবনা-৩ আসন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি।

স্থানীয় রাজনৈতিক মহল মনে করছেন, ধানের শীষের বিরুদ্ধে কোনো প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিলে ভোটের হিসাব-নিকাশ পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক মো. আলী আছগর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করলে ভোটের মাঠ এবং প্রার্থীর অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে, যা পুরো নির্বাচনী পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, একই পরিবারের তিন প্রার্থী ভোটারদের কাছে একটি অনন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। তারা একই পরিবারের হলেও প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক ইতিহাস, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জনসংযোগের দক্ষতা আলাদা। ফলে ভোটাররা কেবল পারিবারিক পরিচয় বা নামের পরিচিতির ওপর নির্ভর করতে পারবেন না; তারা প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা, নীতি এবং স্থানীয় উন্নয়নের প্রভাব বিচার করে ভোট দিতে বাধ্য হবেন।

পাবনা-৩ আসনের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্থানীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, নির্বাচন কেবল পারিবারিক প্রভাব বা দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না; বরং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা, জনসংযোগ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক আন্দোলন-সংগ্রাম, স্বতন্ত্র মনোনয়ন প্রত্যাশী হওয়ার ঘটনা এবং পরিবারের একাধিক প্রার্থী অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করেছে। পাবনা-৩ এলাকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “এই নির্বাচন কেবল ধানের শীষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং একই পরিবারের তিন প্রার্থী এবং স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলনও বয়ে আনে।”

চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলায় ভোটারদের সচেতনতা এবং রাজনৈতিক প্রার্থীদের শক্তিশালী প্রচারণার কারণে নির্বাচনী মাঠ অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, স্থানীয় জনগণ আগামী নির্বাচনে দলীয় নির্দেশনা ও ব্যক্তিগত প্রার্থীর কার্যক্রম বিবেচনা করে ভোট দেবেন। এটি পাবনা-৩ আসনের নির্বাচনী পরিস্থিতি আরও জটিল এবং দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত