প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, কর্মপরিবেশ, সাংবাদিকদের অধিকার এবং রাজনৈতিক চাপমুক্ত পেশাগত দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বহুদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সেই আলোচনাকে আরও স্পষ্ট ও তীব্র করে তুললেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজের দ্বি-বার্ষিকী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সাংবাদিকদের প্রতি একটি জোরালো আহ্বান জানান—রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন অবস্থান গড়ে তুলতে হবে।
সম্মেলনে সারাদেশের ১৮টি অঙ্গ ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা অংশ নেন, যা অনুষ্ঠানটিকে দেশের সাংবাদিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনমেলায় পরিণত করে। দুপুরের সেশন শেষে বিকালে অনুষ্ঠিত হবে কর্ম অধিবেশন, যেখানে সাংগঠনিক বিষয় ও অধিকার আদায়ের কৌশল নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
মির্জা ফখরুল তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব সম্পর্কে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, সাংবাদিকতা কখনোই রাজনৈতিক দলের অনুসারী হবার জায়গা নয়। সাংবাদিকদের দাবি-দাওয়া, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করাই ইউনিয়নগুলোর প্রধান দায়িত্ব। তিনি বলেন, “মিয়া গোলাম পরওয়ার সাহেব ঠিকই বলেছেন—সাংবাদিকদের নিজের দাবি-দাওয়া তুলে ধরা, মালিক পক্ষ ও সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজাই মূল কাজ হওয়া উচিত। কিন্তু যখন সাংবাদিকরা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করেন, তখন সমাধান আসে না। আপনারা বিরোধী দল বা সরকারি দল—যার সাথেই যুক্ত হোন না কেন, তা সাংবাদিক সমাজকে কোনোদিনই শক্তিশালী করতে পারে না।”
তিনি দাবি করেন, গত ১৫ বছরে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ভয়াবহভাবে সংকুচিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “ফ্যাসিবাদ অর্থাৎ শেখ হাসিনা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গণমাধ্যমের জায়গাটাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। সম্পাদক থেকে সাধারণ রিপোর্টার—অনেকে আজ সৎভাবে কাজ করতে ভয় পান। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আপনাদের নেতৃবৃন্দকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সরে এসে প্রকৃত অর্থে পেশাগত ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।”
বিএফইউজের সম্মেলনে বক্তৃতার এক পর্যায়ে ফখরুল বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশবাসী এখন এক ধরনের প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। তিনি মনে করেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে বিরোধী মতের প্রতি সম্মান দেখানো প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ভিন্ন মত পোষণ করলেই শত্রু মনে করা বা অপপ্রচার চালানো গণতন্ত্রের পথ বাধাগ্রস্ত করে।
তিনি বলেন, “গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া নয়, বরং অন্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করা। আমি আপনার সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু আপনার মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশে এখনো এমন মানসিকতা গড়ে ওঠেনি। ভিন্নমত হলেই তাকে হেয় করা, অপমান করা—এটা বন্ধ হওয়া উচিত।”
তাঁর ভাষণে বারবার উঠে আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, “আজকে সবচেয়ে বড় সংকট দাঁড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। সেখানে কোনো দায়বদ্ধতা নেই, যা খুশি লেখা যায়। রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব—কারও বিষয়ে সীমাহীন নেগেটিভ প্রচারণা চালানো হয়। এতে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না; বরং নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়, মব ভায়োলেন্স তৈরি হয়, মানুষকে ভুলভাবে প্রচার করে সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়।”
সম্মেলনে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বিএনপির ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন ফখরুল। তিনি স্মরণ করেন, ১৯৭৫ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনীতি ফিরিয়ে এনে বন্ধ থাকা পত্রিকাগুলো পুনরায় চালু করেন, যা দেশের গণমাধ্যম ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়াও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা ও সম্প্রসারণে কাজ করেছেন বলে দাবী করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমরা আমাদের ৩১ দফায় খুব পরিষ্কারভাবে বলেছি—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবো। পুরোপুরি স্বাধীন, দায়বদ্ধ ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠাই আমাদের অঙ্গীকার।”
সম্মেলনে সাংবাদিকদের অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা, বেতন-বৈষম্য দূরীকরণ এবং মালিক পক্ষের সাথে সমান মর্যাদার আলোচনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে অধিকার আদায় করতে হলে সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোকে শক্তিশালী হতে হবে। তিনি বলেন, “আপনারা যদি আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে ইউনিয়নের শক্তিকে বাড়াতে হবে। আপনাদেরকে শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াতে হবে, কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করলে চলবে না। দায়িত্বশীলতার সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকলে সবার অধিকার রক্ষা করা সম্ভব।”
সম্মেলনের অন্য অংশে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি সাংবাদিকদের ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “সাংবাদিকদের আজকের দুর্দিনে সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে আপনাদের ঐক্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিভক্তি তৈরি হয়েছে, যা পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য ক্ষতিকর। রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় থাকুক, আর সাংবাদিকদের ঐক্য অটুট থাকুক।” তিনি মনে করেন, সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে জাতি গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বিএফইউজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহিন। সঞ্চালনা করেন সিনিয়র সহকারী মহাসচিব বাছির জামাল এবং প্রচার সম্পাদক শাহজাহান সাজু। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইউনিয়ন নেতারা, সিনিয়র সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী ও পেশার বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনজুড়ে সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ, স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক সংকটের মতো বাস্তব সমস্যাগুলো উঠে আসে। বক্তাদের বক্তব্যে একদিকে যেমন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার আহ্বান ছিল, অন্যদিকে ছিল সাংবাদিকদের ঐক্যকে শক্তিশালী করার বার্তা।
সার্বিকভাবে, সম্মেলনটি সাংবাদিক সমাজের বাস্তব সংকট, আগামী দিনের করণীয় এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রামকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। বক্তাদের আহ্বান একটাই—সাংবাদিকরা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজেদের সংগঠনকে শক্তিশালী করে, পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাক।