প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রামগঞ্জে চাচা খুনের এই ঘটনা স্থানীয় জনমনে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করেছে।
লক্ষ্মীপুরের শান্ত জনপদ রামগঞ্জে জমি–বাড়ি সংক্রান্ত বিরোধ দীর্ঘদিন ধরেই অনেক পরিবারের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটেই সোমবার রাতে ঘটে যায় আরেকটি নির্মম হত্যাকাণ্ড। পরিবারের ভেতরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৭০ বছর বয়সী হাসমত উল্যাহ। অভিযোগ উঠেছে, তাঁর নিজের ভাতিজারাই ভাড়া করা বাহিনী নিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ চাচাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি স্থানীয় এলাকাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, দুঃখ ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সোমবার রাত ১১টার দিকে বাঁশঘর গ্রামের আহমেদ আলী হাজী বাড়িতে হাসমত উল্যাহর বসতঘর জোরপূর্বক দখল করতে যায় ভাতিজা তোফায়েল আহম্মেদ ও মোহন। দীর্ঘদিন ধরে জমি–বাড়ি নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ চলছিল। পরিবারের অভিযোগ, দখলের চেষ্টা প্রতিহত করতে গেলে দুই ভাতিজা ভাড়া করা অস্ত্রধারীদের নিয়ে হাসমত উল্যাহ ও তাঁর পরিবারের ওপর আক্রমণ করে। মুহূর্তের মধ্যে মারধর শুরু হলে বৃদ্ধ হাসমত মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁর স্ত্রী, ছেলে–মেয়েরা চিৎকার করে প্রতিবেশীদের ডাকলেও ততক্ষণে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে রামগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, বৃদ্ধ হাসমত শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন, তবুও বয়সকে উপেক্ষা করে নিজের বাড়ি রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে শোকের আবহ নেমে আসে।
হত্যার ঘটনার পরপরই তোফায়েল ও মোহন পালিয়ে যায়। ভোর হতেই উত্তেজিত জনতা জড়ো হতে শুরু করে। স্থানীয়রা ক্ষোভে তাদের বসতঘর ভাঙচুর করেন এবং আসবাবপত্র বের করে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে—যদিও দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে, ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে যায়। এলাকাবাসীদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর যদি তারা দ্রুত ক্ষোভ না দেখাতেন, তাহলে অভিযুক্তরা পালিয়ে আরও বড় ক্ষতি করতে পারত।
ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। স্থানীয়রা তোফায়েল ও মোহনের বাড়ির পাশের বাগান থেকে কিছু ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করেন এবং পুলিশকে খবর দেন। এসব অস্ত্র হামলাকারীরা ব্যবহার করেছে কিনা তা পুলিশ তদন্ত করে দেখছে। রামগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আবদুল বারী জানিয়েছেন, মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী এটি পূর্বশত্রুতাজনিত পরিকল্পিত হামলা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
এ ঘটনায় নিহতের বড় ছেলে শাহীন হোসেন বাদী হয়ে তোফায়েল, মোহন, পৌর যুবদলের সদস্য সুমন চৌধুরীসহ ৮–৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টি তদন্তে প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছে পুলিশ। তারা বলছে, ঘটনার পেছনের আসল কারণ অনুসন্ধান করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রামগঞ্জে এটি প্রথম নয়। গত ২৪ নভেম্বর সাহারপাড়া গ্রামে ওয়ার্ড যুবদল নেতা ইউসুফের দাবিকৃত চাঁদা না দেওয়ায় আনোয়ার হোসেন নামে এক চা দোকানিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় র্যাব মূল আসামিকে ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে রামগঞ্জের শান্ত পরিবেশ অস্থির হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, পারিবারিক বিরোধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং চাঁদাবাজি—সব মিলিয়ে এলাকায় অপরাধের প্রবণতা বেড়ে গেছে। জনগণ রাত নামলেই অজানা আশঙ্কায় ভোগেন। তাদের মতে, সময়মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বৃদ্ধ হাসমতের মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, পুরো গ্রাম শোকে মুহ্যমান। প্রতিবেশীরা জানান, হাসমত উল্যাহ ছিলেন শান্তশিষ্ট ও সহনশীল মানুষ। জীবনে কখনো কারো সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখা যায়নি তাঁকে। তিনি কৃষিকাজে যুক্ত থাকলেও বয়সের কারণে এখন ঘরে সময় কাটাতেন। তাঁর মৃত্যুতে এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন, কারণ তাঁরা এখন মনে করছেন—বাড়ি–জমি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ যে কোনো সময় সহিংস রূপ নিতে পারে।
গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, সমাজে যে ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা কমাতে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে। তারা মনে করেন, দীর্ঘদিনের জমি–বাড়ির বিরোধ প্রশাসনিকভাবে নিষ্পত্তি করা গেলে এমন রক্তপাত কমে যেত। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি এবং টহল বাড়ানো জরুরি।
হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। শাহীন হোসেন বলেন, তাঁর বাবাকে রক্ষা করতে না পারার যন্ত্রণা তিনি কখনো ভুলতে পারবেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিকল্পিতভাবে তাঁর বাবাকে হত্যা করা হয়েছে এবং তিনি হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তি চান। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা করছেন, মামলার পর হামলাকারীরা পালিয়ে বেড়ালে তারা আরও ক্ষতি করতে পারে।
রামগঞ্জে টানা দুটি হত্যাকাণ্ড, তাও ক’দিনের মধ্যে, স্থানীয় প্রশাসনের নজর কাড়ার পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার দিকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করছে, অপরাধীরা যত ক্ষমতাধরই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তারা বলছে, এই ঘটনার দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করা হবে।
গ্রামবাসীর প্রত্যাশা, হাসমত উল্যাহ হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হোক, যাতে দৃষ্টান্ত তৈরি হয় এবং আর কোনো পরিবার এভাবে নৃশংসতার শিকার না হয়।