গাজাবাসীকে ঘিরে ইসরাইলের নতুন পরিকল্পনা, উদ্বেগের কণ্ঠে বিশ্ব

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ জুলাই, ২০২৫
  • ৪২ বার

প্রকাশ: ৯ জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের অস্থায়ী নয়, স্থায়ী বাস্তুচ্যুতির নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ যে পরিকল্পনার কথা সরাসরি জানিয়েছেন, তা গাজার কয়েক দশকের মানবিক সংকটকে আরেক ধাপে অনিশ্চয়তার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সোমবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কাৎজ ঘোষণা করেন, গাজার সর্বদক্ষিণ প্রান্ত রাফাহ শহরের ধ্বংসাবশেষের ওপর গড়ে তোলা হবে একটি ‘মানবিক শহর’। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে শুরুতে ছয় লাখ ফিলিস্তিনিকে স্থানান্তর করা হবে, পর্যায়ক্রমে পুরো ২১ লাখ গাজাবাসীকে সেখানে গাদাগাদি করে রাখা হবে—তাও কড়া নিরাপত্তা তল্লাশি শেষে, যাতে হামাসের কোনো সহানুভূতিশীল বা সদস্য সেখানে প্রবেশ করতে না পারে। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, একবার এ শহরের ভেতরে এলে তাদের আর বের হতে দেওয়া হবে না।

ইসরাইলি মানবাধিকার আইনজীবী মাইকেল স্ফার্ড এই পরিকল্পনাকে সরাসরি ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সাজানো অভিযানের অংশ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্ফার্ড বলেন, ‘গাজার দক্ষিণে শরণার্থী শিবিরের নামে এই জনবিন্যাসের আসল উদ্দেশ্য হলো তাদের স্থায়ী নির্বাসন। যাতে পরবর্তী ধাপে উপত্যকার বাইরে পাঠানো সহজ হয়।’

জাতিসংঘ বহুবার মনে করিয়ে দিয়েছে, দখলকৃত কোনো ভূখণ্ড থেকে বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে জোর করে বিতাড়ন করা আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্টতই নিষিদ্ধ। এর আগে এমন পদক্ষেপকে জাতিসংঘ ‘জাতিগত নির্মূলের সমতুল্য’ বলে চিহ্নিত করেছে।

এ পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথোপকথন নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিতর্কে। নেতানিয়াহু সেখানে সরাসরি বলেন, যুদ্ধোত্তর গাজা যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক দখলে থাকা উচিত এবং ফিলিস্তিনিদের স্থায়ী পুনর্বাসনও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বেই অন্যত্র সম্পন্ন হওয়া উচিত। তাঁর ভাষায়, ‘ট্রাম্পের এই প্রস্তাব একটি উজ্জ্বল দৃষ্টিভঙ্গি। কেউ থাকতে চাইলে থাকবে, যেতে চাইলে যাবে—এটাই স্বাধীনতা।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও জানান, গাজার ভবিষ্যত নির্ধারণে আশপাশের আরব দেশগুলো ‘দারুণ সহযোগিতা’ দিচ্ছে বলে তিনি আশাবাদী।

তবে আরব রাষ্ট্রগুলো এ নিয়ে পুরোপুরি ভিন্ন সুরে কথা বলছে। মার্চ মাসেই মিশর ৫৩ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনায় সমর্থন দেয়, যার মূল কথা—ফিলিস্তিনিরা যেন তাদের নিজ ভূমিতেই টিকে থাকতে পারে। আরব নেতারা এই পরিকল্পনাকে ‘বাস্তুচ্যুতির যে কোনো চেষ্টার স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং সরাসরি জাতিগত নির্মূলের নামান্তর।’ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও হামাসও মিশরের উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই পরিকল্পনাকে কার্যত ‘অবাস্তব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

গাজাবাসী আজও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নিয়ে আতঙ্কিত। তাদের কাছে ‘নাকবা’ শব্দটি এক ভয়াবহ স্মৃতি—১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের পর লাখ লাখ ফিলিস্তিনি যেভাবে গৃহহীন হয়েছিল, সেই একই পরিণতির আশঙ্কা করছেন অনেকে। গাজায় বর্তমানে বসবাসরত মানুষের প্রায় তিন–চতুর্থাংশই সেই শরণার্থীদের বংশধর। জাতিসংঘের হিসাব বলছে, এ ছাড়া পশ্চিম তীরে নয় লাখ এবং জর্ডান, লেবানন, সিরিয়ায় আরও প্রায় ৩৪ লাখ নিবন্ধিত ফিলিস্তিনি শরণার্থী রয়েছেন।

গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক সীমান্ত হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলের পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানে ইতিমধ্যেই গাজার জনজীবন বিপর্যস্ত। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ৫৭ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহতের সংখ্যা এক লাখ দশ হাজারের বেশি, যাদের এক–চতুর্থাংশের জীবনের মান আর কখনও স্বাভাবিক হবে না বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে।

একইসঙ্গে গাজার অধিকাংশ মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নব্বই শতাংশের বেশি বসতবাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত, ধ্বংস হয়ে গেছে হাসপাতাল, স্কুল, পানি সরবরাহ আর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও। খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি—সবকিছুরই তীব্র সংকট ক্রমেই মানবিক বিপর্যয়কে গভীর করছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যে জনগোষ্ঠী নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে শরণার্থী শিবিরেই বংশ পরম্পরায় বেঁচে আছে, তাদের আরেক দফা ‘স্থায়ী শিবিরে’ আটকে রাখার ইসরাইলি উদ্যোগ সত্যিই কি শুধুই ‘মানবিক’? নাকি এটি আরেকটি নাকবার অশনি সংকেত? উত্তরের জন্য তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব, আর তার সাথে নিঃস্ব গাজাবাসী—যারা শূন্যের মধ্যেই বাঁচার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন অবিচল প্রতিরোধ আর বেদনার ইতিহাস বুকে নিয়ে।

গাজাবাসীকে নিয়ে ইসরাইলের ‘নতুন পরিকল্পনা

গাজায় অবস্থিত সব ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণাঞ্চলের একটি ক্যাম্পে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ইসরাইলের গণমাধ্যমগুলোতে এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ সোমবার সাংবাদিকদের বলেন—তিনি রাফাহ শহরের ধ্বংসাবশেষের ওপর একটি ‘মানবিক শহর’ প্রতিষ্ঠা করতে চান। শহরটি পুরো ২১ লাখ জনসংখ্যার জন্য হলেও সেখানে প্রাথমিকভাবে ছয় লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করতে পারবেন।

তিনি বলেন—নিরাপত্তা তল্লাশির পর মানুষজনকে এই শহরের ভেতরে আনার লক্ষ্য ছিল যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় তারা হামাসের কর্মী নয় এবং তাদের আর সেখান থেকে বের হতে দেওয়া হবে না।

যদি পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে তাহলে ইসরাইল ও হামাসের ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সমঝোতা চেষ্টার সময় নির্মাণকাজ শুরু হবে।

ইসরাইলি মানবাধিকার আইনজীবী মাইকেল স্ফার্ড এটিকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য পরিকল্পিত অভিযান’ ছাড়া আর কিছুই নয় বলে নিন্দা জানিয়েছেন।

গার্ডিয়ান নিউজপেপারকে তিনি বলেছেন—জনগণকে যাতে এই উপত্যকার বাইরে নির্বাসনে পাঠানো যায় তারই প্রস্তুতির অংশ গাজার দক্ষিণ প্রান্তে জনগণকে স্থানান্তর।

এর আগে জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, অধিকৃত ভূখণ্ডের বেসামরিক জনগোষ্ঠীর নির্বাসন বা জোরপূর্বক স্থানান্তর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং ‘জাতিগত নির্মূলের সমতুল্য’।

সোমবার হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিষয়ে বলেন—যুদ্ধ পরবর্তী গাজা আমেরিকার দখলে নেওয়া উচিত এবং এর জনসংখ্যা স্থায়ীভাবে অন্যত্র পুনর্বাসিত করা উচিত।

নেতানিয়াহু বলেন—আমি মনে করি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এটাকে বলা হয় স্বাধীন পছন্দ। যদি মানুষ থাকতে চায়, তারা থাকতে পারে। কিন্তু যদি তারা চলে যেতে চায় তবে তাদের চলে যেতে পারা উচিত।

তিনি আরও বলেন—আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে খুব নিবিড়ভাবে কাজ করছি এমন দেশগুলোকে খুঁজে বের করার জন্য যারা সবসময় যা বলে তা উপলব্ধি করতে চাইবে যে তারা ফিলিস্তিনিদের একটি উন্নত ভবিষ্যৎ দিতে চেয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন—আশপাশের দেশগুলো থেকে আমরা দারুণ সহযোগিতা পেয়েছি। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই দারুণ সহযোগিতা। তাই ভালো কিছু ঘটবে।

মার্চ মাসে আরব রাষ্ট্রগুলো গাজার পুনর্গঠনের জন্য ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে গিয়ে মিশরের ৫৩ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনায় সমর্থন দিয়েছিল। যেটি গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের তাদের জায়গায় থাকার সুযোগ করে দেবে।

‘ফিলিস্তিনি জনগণের যে কোনো ধরনের বাস্তুচ্যুতির স্পষ্ট প্রত্যাখ্যানের ওপর জোর দিয়ে তারা এই ধারণাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং জাতিগত নির্মূল’ বলে ব্যাখ্যা করেছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং হামাসও মিশরের এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল বলেছে তারা গাজার বাস্তবতা মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে।

ফিলিস্তিনিরা নাকবার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা করছে, যেটির আরবি শব্দ ‘বিপর্যয়’, যা ঘটেছিল ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে এবং যুদ্ধের সময় যখন লাখ লাখ মানুষ তাদের বাড়িঘর থেকে পালিয়ে গিয়েছিল অথবা বিতাড়িত হয়েছিল।

এই শরণার্থীদের অনেকেই গাজায় আশ্রয় নিয়েছেন। যেখানে তারা এবং তাদের বংশধররাই ওই জনসংখ্যার তিন – চতুর্থাংশ।

জাতিসংঘ বলছে, আরও নয় লাখ নিবন্ধিত শরণার্থী অধিকৃত পশ্চিম তীরে বাস করে। আরও ৩৪ লাখ জর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননে বাস করে।

২০২৩ সালের সাতই অক্টোবর হামাসের সীমান্ত হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে গাজায় অভিযান শুরু করে।

গাজায় হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি হামলা শুরুর পর থেকে গাজায় ৫৭ হাজার পাঁচশো জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

গাজার বেশিরভাগ জনগণ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। নব্বই শতাংশের বেশি বাড়িঘর ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবা, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ঘাটতি রয়েছে খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ এবং আশ্রয়ের।

জানুয়ারিতে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল—এক লাখ ১০ হাজার ৪৫৩ জন ফিলিস্তিনি এই হামলায় আহত হয়েছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত ৩ জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে জানায়—এই আহতদের মধ্যে ২৫ শতাংশের আঘাত এতটাই গুরুতর যে তাদের জীবন আর আগের অবস্থায় ফিরবে না।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত